খেলাধুলা
৮ জুন, ২০২৬

বিশ্ব ক্রীড়াঙ্গনে নতুন অধ্যায়: ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬, ৪৮ দলের অংশগ্রহণে সবচেয়ে বড় আসর

বিশ্ব ক্রীড়াঙ্গনে নতুন অধ্যায়: ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬, ৪৮ দলের অংশগ্রহণে সবচেয়ে বড় আসর

বিশ্ব ক্রীড়াঙ্গন এখন এক ঐতিহাসিক মুহূর্তের অপেক্ষায়, কারণ ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে বড় আসর—ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬ উত্তর আমেরিকার তিন দেশ যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা এবং মেক্সিকোতে যৌথভাবে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। ৪৮ দলের অংশগ্রহণে এই মেগা টুর্নামেন্টের পর্দা উঠছে আগামী ১১ জুন ২০২৬। উদ্বোধনী ম্যাচটি অনুষ্ঠিত হবে মেক্সিকোর ঐতিহ্যবাহী এস্তাদিও আজতেকা স্টেডিয়ামে, যা এই নিয়ে তৃতীয়বারের মতো বিশ্বকাপের উদ্বোধনী আয়োজনের বিরল গৌরব অর্জন করবে। মেক্সিকো সিটি লক্ষ লক্ষ দর্শকের কোলাহল এবং নয়নাভিরাম সাংস্কৃতিক পরিবেশনার মধ্য দিয়ে বিশ্ব ফুটবলের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হবে। এই উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিন দেশের সংস্কৃতি, সঙ্গীত এবং ফুটবলের প্রতি উচ্ছ্বাস একীভূত হবে।

বিশ্বকাপের এই আয়োজনে লিওনেল মেসি, ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো এবং কিলিয়ান এমবাপ্পের মতো তারকারা অংশ নিচ্ছেন। যদিও ব্রাজিলের নেইমার জুনিয়রের অংশগ্রহণ নিয়ে কিছু অনিশ্চয়তা ছিল, অবশেষে তাকেও ব্রাজিলের চূড়ান্ত স্কোয়াডে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এর ফলে, এবারের বিশ্বকাপ ফুটবল চার মহাতারকার পায়ের জাদুতে উজ্জ্বল হয়ে উঠবে। সমস্ত জল্পনা-কল্পনা এবং অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে মাঠে বল গড়ানোর পালা। এস্তাদিও আজতেকা সহ প্রতিটি ভেন্যু নতুন নায়কের উত্থান বা কোনো ট্র্যাজিক হিরোর বিদায়ের সাক্ষী হতে প্রস্তুত। টুর্নামেন্টের ৩৯ দিন জুড়ে কোটি কোটি ফুটবল প্রেমীর দৃষ্টি থাকবে এই মাঠগুলোর দিকে। ঐতিহাসিক ‘ট্রাইওল্ডার’ বলের সাথে এই ফুটবল মহোৎসবের মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে কেবল একটাই সুর বাজবে—‘দ্য গ্রেটেস্ট শো অন আর্থ’ শুরু হলো।

ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬ হবে ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে বড় এবং বৈচিত্র্যপূর্ণ আসর। আগামী ১১ জুন ২০২৬, মেক্সিকোর ঐতিহাসিক এস্তাদিও আজতেকা স্টেডিয়ামে স্থানীয় সময় দুপুর ১টা এবং বাংলাদেশ সময় ১২ জুন শুক্রবার রাত ১টায় মেক্সিকো বনাম দক্ষিণ আফ্রিকার ম্যাচ দিয়ে এই মহাযজ্ঞের শুভসূচনা হবে। খেলার প্রাক্কালে এক জমকালো উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে দর্শকরা উপভোগ করবেন মনোমুগ্ধকর সাংস্কৃতিক পরিবেশনা, ড্রোন শো এবং বর্ণিল আতশবাজির ঝলকানি।

মেক্সিকো সিটির ঐতিহাসিক এস্তাদিও আজতেকা স্টেডিয়ামে প্রথমবারের মতো ৪৮টি দল নিয়ে আয়োজিত হতে যাচ্ছে এই টুর্নামেন্ট। পূর্বের ৩২ দলের অংশগ্রহণকে বাড়িয়ে ১৬টি দল যুক্ত করে টুর্নামেন্টের পরিধি বৃদ্ধি করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা এবং মেক্সিকো—এই তিনটি দেশ ১১ জুন থেকে ১৯ জুলাই পর্যন্ত বিশ্ব আসরটির আয়োজন করবে। এবারের আসরে ফুটবল বিশ্বের বর্তমান এবং উদীয়মান অনেক মহাতারকাকে দেখা যাবে। আগামী ১৯ জুলাই ২০২৬, নিউ ইয়র্ক নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে গ্র্যান্ড ফাইনালের মাধ্যমে বিশ্বকাপের পর্দা নামবে।

এই বিশ্বকাপ ফুটবলের শিরোপা জয়ের দৌড়ে ফ্রান্স, স্পেন এবং বর্তমান চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছে। বর্তমানে ফিফা র‍্যাঙ্কিংয়ে স্পেন শীর্ষে অবস্থান করছে এবং তরুণ প্রতিভাদের নিয়ে দুর্দান্ত ফর্মে রয়েছে। কিলিয়ান এমবাপ্পের নেতৃত্বে শক্তিশালী আক্রমণভাগ নিয়ে ফ্রান্সেরও বিশ্বকাপ জয়ের সম্ভাবনা উজ্জ্বল। অন্যদিকে, বর্তমান বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন ও কোপা আমেরিকা বিজয়ী হিসেবে আর্জেন্টিনা শিরোপা ধরে রাখার অন্যতম দাবিদার। এছাড়া ইংল্যান্ড এবং ব্রাজিলও শিরোপা জয়ের লড়াইয়ে শক্তিশালী প্রতিযোগী হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

এবারের বিশ্বকাপ ফুটবলে প্রথমবারের মতো ৩২টির পরিবর্তে ৪৮টি দল মূল পর্বে অংশগ্রহণ করবে। পূর্বের ৬৪টি ম্যাচের পরিবর্তে এবার মোট ১০৪টি ম্যাচ অনুষ্ঠিত হবে। ৪৮টি দলকে ১২টি গ্রুপে ভাগ করা হয়েছে, যেখানে প্রতিটি গ্রুপে চারটি করে দল থাকবে। টুর্নামেন্টে নতুন করে ‘রাউন্ড অব ৩২’ ধাপটি যুক্ত করা হয়েছে। যেখানে প্রতিটি গ্রুপের শীর্ষ দুই দল এবং সেরা আটটি তৃতীয় স্থান অধিকারী দল নকআউট পর্বে খেলার যোগ্যতা অর্জন করবে। যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো ও কানাডার মোট ১৬টি শহরে এই ১০৪টি ম্যাচ আয়োজিত হবে। যুক্তরাষ্ট্রের ১১টি শহরে—আটলান্টিক, বস্টন, ডালাস, হিউস্টন, কানসাস সিটি, লস অ্যাঞ্জেলেস, মিয়ামি, নিউ ইয়র্ক নিউ জার্সি, ফিলাডেলফিয়া, সান ফ্রান্সিসকো এবং সিয়াটলে খেলা হবে। মেক্সিকোর তিনটি শহর—গুয়াদালাজারা, মেক্সিকো সিটি এবং মনটেরি। কানাডার দুটি শহর—টরন্টো এবং ভ্যাঙ্কুভার।

১১ জুন মেক্সিকো বনাম দক্ষিণ আফ্রিকার মধ্যকার ম্যাচ দিয়ে টুর্নামেন্ট শুরু হবে। এস্তাদিও আজতেকা স্টেডিয়াম এবার বিশ্বকাপের তিনটি উদ্বোধনী ম্যাচ আয়োজনের মাধ্যমে রেকর্ড গড়বে। এই স্টেডিয়ামটি ফুটবল ইতিহাসের দুই কিংবদন্তি পেলে ও ম্যারাডোনার বিশ্বকাপ জয়ের সাক্ষী। ১৯৭০ সালে পেলে এবং ১৯৮৬ সালে ম্যারাডোনা এই মাঠেই ট্রফি উঁচিয়ে ধরেছিলেন। ফিফা ঘোষণা করেছে, প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের ফাইনালে নিউ ইয়র্ক নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে এনএফএল-এর ‘সুপার বোল’-এর আদলে একটি জমকালো ‘হাফটাইম শো’ অনুষ্ঠিত হবে।

এই বিশ্বকাপ আয়োজনে তিনটি স্বাগতিক দেশের প্রতিনিধিত্ব করার জন্য তিনটি ‘মাসকট’ নির্বাচন করা হয়েছে।

এই বিশ্বকাপ অনন্য কেন:

  • প্রথমবারের মতো ৪৮ দল: ফুটবলকে আরও ছড়িয়ে দেওয়ার লক্ষ্যে ফিফা দলের সংখ্যা ৩২ থেকে বাড়িয়ে ৪৮ করেছে, যা ছোট দেশগুলোর জন্য বড় মঞ্চে নিজেদের প্রমাণ করার সুযোগ বাড়াবে।
  • নতুন নকআউট পর্ব: গ্রুপ পর্বের সেরা দুই দল এবং সেরা আটটি তৃতীয় স্থান অধিকারী দল নকআউট পর্বে উন্নীত হবে। এর ফলে ‘রাউন্ড অব ১৬’-এর আগে ‘রাউন্ড অব ৩২’ নামে একটি অতিরিক্ত ধাপ যুক্ত হয়েছে।

উদ্বোধন অনুষ্ঠানে জৌলুস:

এস্তাদিও আজতেকা স্টেডিয়ামে বিশ্বকাপের জমকালো উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে স্বাগতিক তিন দেশ—যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো এবং কানাডার ঐতিহ্য ও আধুনিক সংস্কৃতির এক অনবদ্য মেলবন্ধন দেখা যাবে। শত শত পারফর্মার ও নৃত্যশিল্পীর অংশগ্রহণে কোরিওগ্রাফি প্রদর্শিত হবে, সাথে থাকবে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন তারকাশিল্পীদের লাইভ পারফরম্যান্স। অত্যাধুনিক আলোকসজ্জা, পাইরোটেকনিকস এবং স্টেডিয়ামজুড়ে বিশেষ ভিজ্যুয়াল ইফেক্টের মাধ্যমে দর্শকদের এক জাদুকরী অভিজ্ঞতা দেওয়ার প্রস্তুতি চলছে। বিশ্বকাপ ফুটবলের কিংবদন্তিরাও অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে এর জৌলুস বাড়াবেন। তিন মাসকট—মেপল (মুজ), জায়ু (জাগুয়ার) এবং ক্লাচ (ইগল) বিশেষ আকর্ষণ হিসেবে থাকবে। বিশ্বকাপের অফিশিয়াল বল ‘ট্রাইওন্ডা’ ও থিম সং-এর বিশেষ উপস্থাপনা করা হবে। কয়েক হাজার ড্রোনের সমন্বয়ে আকাশে ফুটবল, বিশ্বকাপ ট্রফি এবং ৪৮ দেশের মানচিত্র ও পতাকা তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে। আকাশে থাকবে বর্ণিল আতশবাজি এবং লেজার শো।

বিশ্বকাপের ১৭ পোস্টার:

বিশ্বকাপ ফুটবল ২০২৬ উপলক্ষে ১৭টি পোস্টার প্রকাশ করা হয়েছে। এর মধ্যে ১৬টি পোস্টার আয়োজক শহরের এবং একটি হলো অফিশিয়াল টুর্নামেন্ট পোস্টার, যা তিন দেশের ঐক্য প্রদর্শন করে। অফিশিয়াল পোস্টারে তিন আয়োজক দেশ—যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো এবং কানাডার প্রতিনিধিত্ব বোঝাতে নীল, লাল ও সবুজ রঙ ব্যবহার করা হয়েছে। কানাডার অংশে মেপল পাতা এবং কানের টুপি পরা একটি গ্রিজলি ভালুক, সঙ্গে একটি মুজ (হরিণ বিশেষ) ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। মেক্সিকান সংস্কৃতি ফুটিয়ে তুলতে জাতীয় প্রতীকের ইগল, মেরিগোল্ড ফুল, ট্রাম্পেট এবং মারাকাস ব্যবহার করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের পতাকার অনুকরণে লাল-সাদা-নীল রঙের তারা ও স্ট্রাইপ ব্যবহার করা হয়েছে। ১৬টি আয়োজক শহরের পোস্টারে ওই অঞ্চলের ঐতিহ্য ও ফুটবলের প্রতি আবেগ তুলে ধরা হয়েছে। টুর্নামেন্ট পোস্টারটি তিন আয়োজক দেশের শিল্পী মিলে তৈরি করেছেন, আর বাকি ১৬টি পোস্টার প্রতিটি স্বাগতিক শহরের স্থানীয় শিল্পীরা তৈরি করেন, যা বাছাই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নির্বাচিত হয়।

আফ্রিকার চমক:

এবার আফ্রিকা মহাদেশ থেকে রেকর্ডসংখ্যক ১০টি দল অংশ নিতে যাচ্ছে। তবে নাইজেরিয়া ও ক্যামেরুনের মতো শক্তিশালী দলগুলো বাছাইপর্ব পার হতে না পারায় ফুটবল বিশ্বে বেশ আলোচনা তৈরি হয়েছে।

পরিবর্তিত নিয়মকানুন:

ফিফা এই বিশ্বকাপে খেলার গতি বাড়াতে এবং সময় অপচয় রোধ করতে পাঁচটি নতুন নিয়ম প্রয়োগের পরিকল্পনা করছে। এর মধ্যে কর্নার কিকের নিয়মে বড় পরিবর্তন এবং ভিএআর (VAR)-এর ক্ষমতা আরও বাড়ানো একটি আলোচিত বিষয়।

বিশ্বকাপ মাসকটের গল্প:

ফিফা প্রথমবারের মতো ২০২৬ বিশ্বকাপের তিনটি মাসকট উন্মোচন করেছে, যা আয়োজক তিন দেশ—কানাডা, মেক্সিকো এবং যুক্তরাষ্ট্রের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির প্রতিফলন। মাসকট তিনটির নাম হলো—মেপল (Maple), জায়ু (Zayu) এবং ক্লাচ (Clutch)।

মেপল কানাডার একটি ‘মুজ’ (Moose) বা বড় হরিণ জাতীয় প্রাণী, যা কানাডার জাতীয় প্রতীক এবং মেপল পাতা থেকে অনুপ্রাণিত। তাকে একজন অদম্য ‘গোলরক্ষক’ হিসেবে চিত্রিত করা হয়েছে, যা সৃজনশীলতা ও সহনশীলতার প্রতীক।

জায়ু মেক্সিকোর একটি শক্তিশালী ‘জাগুয়ার’। দেশটির সমৃদ্ধ ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির প্রতিনিধিত্ব করে জায়ু। মাঠে তাকে একজন গতিশীল ও দক্ষ ‘স্ট্রাইকার’ হিসেবে দেখানো হয়েছে, যে মেক্সিকান ঐতিহ্য, নৃত্য ও খাবারের প্রতি অনুরাগী।

ক্লাচ একটি ‘টাক ইগল’, যা যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় পাখি। তাকে একজন দক্ষ ‘মিডফিল্ডার’ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে, যে চাপের মুখেও দলের মধ্যে একতা ও বন্ধন বজায় রাখে। সে সাহস ও নেতৃত্বের প্রতীক।

বিশ্বকাপের অফিশিয়াল গান:

২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের অফিশিয়াল গান ‘লাইটার’ মুক্তি পেয়েছে। গানটিতে কণ্ঠ দিয়েছেন আমেরিকান কান্ট্রি স্টার জেলি রোল এবং মেক্সিকান গায়ক কারিন লিওন। এটি মূলত বৈশ্বিক ঐক্যের গান, যেখানে আয়োজক তিনটি দেশ—কানাডা, মেক্সিকো এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গীত প্রতিভাকে এক সূত্রে গাঁথা হয়েছে। ফিফার সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর মতে, এই গানটির লক্ষ্য হলো একটি গ্লোবাল রিদম বা বৈশ্বিক ছন্দ তৈরি করা, যা ফুটবল ও সঙ্গীতের মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে উৎসবের আমেজ ছড়িয়ে দেবে।

হাফ-টাইম শো:

২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ফাইনাল খেলায় একটি জমকালো ‘হাফ-টাইম শো’ (বিরতির প্রদর্শনী) আয়োজন করা হচ্ছে। নিউ ইয়র্ক নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে ফাইনালের বিরতির সময় এই শোটি ‘সুপার বোল’-এর আদলে তৈরি করা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক সংস্থা গ্লোবাল সিটিজেন ফিফার সঙ্গে যৌথভাবে এটি আয়োজন করছে। ব্রিটিশ রক ব্যান্ড কোল্ডপ্লে-এর প্রধান গায়ক ক্রিস মার্টিন শোটির কিউরেটর হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। সাধারণ ফুটবলের ১৫ মিনিটের বিরতির পরিবর্তে এই শোটির জন্য খেলার বিরতি ২৫ মিনিট পর্যন্ত দীর্ঘ হতে পারে।

যেসব তারকা ফুটবলারের দিকে থাকবে দর্শকদের চোখ:

  • লিওনেল মেসি (আর্জেন্টিনা): বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনার অধিনায়ক লিওনেল মেসি এবার তার ষষ্ঠ বিশ্বকাপে অংশ নিতে পারেন। আর্জেন্টিনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন (এএফএ) এবং কোচ লিওনেল স্কালোনি তাকে দলে পাওয়ার ব্যাপারে আশাবাদী। মেসির এটিই সম্ভবত শেষ বিশ্বকাপ হতে চলেছে।
  • ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো (পর্তুগাল): কিংবদন্তি সিআরসেভেন ইতোমধ্যে নিশ্চিত করেছেন, ২০২৬ বিশ্বকাপই হবে তার ক্যারিয়ারের শেষ বড় টুর্নামেন্ট। ৪১ বছর বয়সে ষষ্ঠবারের মতো বিশ্বকাপে অংশ নিয়ে ইতিহাস গড়ার অপেক্ষায় আছেন তিনি, দলের অন্যতম ভরসা তিনি।
  • লুকা মদ্রিচ (ক্রোয়েশিয়া): ক্রোয়েশিয়ার ৪০ বছর বয়সি এই তারকা ২০২৬ বিশ্বকাপ খেলার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন। জাতীয় দলকে নেতৃত্ব দিয়ে ইতোমধ্যে তিনি মূলপর্ব নিশ্চিত করেছেন।
  • নেইমার জুনিয়র (ব্রাজিল): ইনজুরি ও ফিটনেস সমস্যার কারণে দলের বাইরে থাকলেও নেইমার ২০২৬ বিশ্বকাপকে পাখির চোখ করেছেন। ব্রাজিলের হয়ে প্রথম বিশ্বকাপ শিরোপার স্বপ্নে তিনি বর্তমানে ফিটনেস পুনরুদ্ধারে কাজ করছেন। ইনজুরি কাটিয়ে আবার ব্রাজিলের হেক্সা জয়ের মিশনে নেতৃত্ব দিতে পারেন এই তারকা।
  • কিলিয়ান এমবাপ্পে (ফ্রান্স): বর্তমানে বিশ্বের সেরা খেলোয়াড়দের অন্যতম কিলিয়ান এমবাপ্পে ফ্রান্সের অধিনায়ক হিসেবে মাঠে থাকবেন। ইতোমধ্যে ফ্রান্স মূল পর্ব নিশ্চিত করেছে এবং এমবাপ্পে তার ক্যারিয়ারের দ্বিতীয় বিশ্বকাপ ট্রফি জয়ের মিশনে নামবেন।
  • এডিন জেকো (বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা): ৪০ বছর বয়সেও বসনিয়াকে বিশ্বকাপে তুলে কিংবদন্তিতুল্য পারফরম্যান্স দেখিয়েছেন এই ফরোয়ার্ড।
  • আরলিং হালান্ড (নরওয়ে): ২৮ বছর পর নরওয়ের বিশ্বকাপে জায়গা করে নেওয়ায় এবার হালান্ডের গোলবর্ষণ দেখার অপেক্ষায় ফুটবল বিশ্ব।
  • ভিনিসিয়ুস জুনিয়র (ব্রাজিল): রিয়াল মাদ্রিদ তারকা ভিনিসিয়ুস বর্তমানে ব্রাজিলের আক্রমণের প্রধান অস্ত্র।
  • হ্যারি কেন (ইংল্যান্ড): ইংল্যান্ডের গোল মেশিন হ্যারি কেন দলের অধিনায়ক হিসেবে অন্যতম তারকা।
  • লামিন ইয়ামাল (স্পেন): বর্তমানে ফুটবল বিশ্বের আলোচিত কিশোর স্পেনের লামিন ইয়ামাল এবার ১৮ বছর বয়সে দেশের পক্ষে প্রথম বিশ্বকাপে চমক দেখাতে পারেন। তার ড্রিবলিং এবং নিখুঁত পাসিং তাকে এবারের বিশ্বকাপের অন্যতম আকর্ষণ করে তুলবে।
  • জুড বেলিংহ্যাম (ইংল্যান্ড): ইংল্যান্ডের জুড বেলিংহ্যাম দেশের হয়ে মাঝমাঠের প্রাণভোমরা হিসেবে চমক দেখাবেন এমন প্রত্যাশা।
  • জামাল মুসিয়ালা ও ফ্লোরিয়ান উইর্টজ (জার্মানি): জার্মানির জামাল মুসিয়ালা ও ফ্লোরিয়ান উইর্টজ নতুন প্রজন্মের এই দুই তারকা টুর্নামেন্ট মাতাতে প্রস্তুত হচ্ছেন।
  • আরজা গুলের (তুরস্ক): তুরস্কের আরজা গুলের নামে এই তরুণ প্রতিভা ‘তুর্কি মেসি’ নামে পরিচিত। দূরপাল্লার শট এবং ক্রিয়েটিভ পাসের মাধ্যমে তিনি তুরস্ককে বিশ্বকাপ মঞ্চে অনেক দূর নিয়ে যেতে পারেন।
  • এন্ড্রিক (ব্রাজিল): ব্রাজিলের এন্ড্রিক দেশটির পরবর্তী বড় তারকা হিসেবে সবার মুখে মুখে। মাত্র ১৯ বছর বয়সে রিয়াল মাদ্রিদে যোগ দেওয়া এই স্ট্রাইকারকে পেলের উত্তরসূরি ভাবা হচ্ছে। তার গতি ও ফিনিশিং প্রতিপক্ষ রক্ষণভাগের জন্য ভয়ের কারণ।
  • পাও কুবারসি (স্পেন): স্পেনের পাও কুবারসি ডিফেন্ডার হওয়া সত্ত্বেও মাত্র ১৭-১৮ বছর বয়সে যেভাবে খেলা নিয়ন্ত্রণ করেন, তা অবিশ্বাস্য। তাকে স্পেনের রক্ষণভাগের আগামীর কাণ্ডারি ভাবা হচ্ছে।
  • অন্যান্য তরুণ প্রতিভারা: ফ্রান্সের ওয়ারেন জাইর-এমেরি, ইংল্যান্ডের কোবি মাইনো এবং পর্তুগালের জোয়াও নেভেসও এবারের বিশ্বকাপে নজর কাড়বেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।

বিশ্বকাপ মঞ্চে পেলে-ম্যারাডোনাকে স্মরণ:

এবারের বিশ্বকাপে ফুটবল জগতের দুই কিংবদন্তি পেলে ও দিয়েগো ম্যারাডোনাকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। তাদের স্মৃতি এবং অমর কীর্তি স্মরণীয় করে রাখার জন্য উদ্বোধনী মাঠ মেক্সিকোর এস্তাদিও আজতেকা স্টেডিয়ামে তাদের ছবি রাখা হবে। এই এস্তাদিও আজতেকা মাঠেই ১৯৭০ সালের এবং ম্যারাডোনার ১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপ জয়ের আইকনিক মুহূর্তগুলো বড় পর্দায় এবং স্টেডিয়ামের বিভিন্ন সাজসজ্জায় প্রদর্শন করা হবে। ফিফা ইতোমধ্যেই এই মাঠকে ‘ফুটবলের ক্যাথেড্রাল’ হিসেবে অভিহিত করেছে। হোস্ট সিটি পোস্টারে এস্তাদিও আজতেকা স্টেডিয়ামের পাশেই দুই কিংবদন্তির ছোঁয়া এবং মেক্সিকান লোকজ শিল্পের প্রতিফলন ঘটানো হয়েছে। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের লাইভ পারফরম্যান্সে পেলের ‘হেডার’ গোল এবং ম্যারাডোনার ‘গোল অব দ্য সেঞ্চুরি’র ভিডিও ক্লিপ ও গ্রাফিকস প্রদর্শিত হবে, যা ভক্তদের সেই সোনালি সময়ে ফিরিয়ে নিয়ে যাবে। ম্যারাডোনার স্মরণে আর্জেন্টিনা ইতোমধ্যেই বিশেষ স্মারক মুদ্রা প্রকাশ করেছে।

খেলার দর্শক ও টিকিট বিক্রি:

এবার ফুটবল বিশ্বকাপের দর্শক সংখ্যা এ যাবৎকালের সর্বোচ্চ হতে যাচ্ছে। তিন দেশের ১৬টি ভেন্যুতে ১০৪টি খেলা দেখার জন্য ৫০ থেকে ৭৩ লাখ দর্শক মাঠে থাকবেন বলে আশা করা হচ্ছে। এর আগে ১৯৯৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রে বিশ্বকাপে ৩৫ লাখ দর্শক মাঠে সরাসরি খেলা দেখেছিল। এবার দর্শকদের ৮৩ শতাংশ যুক্তরাষ্ট্রে এবং বাকি ১৭ শতাংশ মেক্সিকো ও কানাডার মাঠে খেলা দেখবেন। ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর মতে, প্রায় ৬০০ কোটি মানুষ এবার টিভি, সোশ্যাল মিডিয়া এবং অনলাইন স্ট্রিমিংয়ের মাধ্যমে বিশ্বকাপ ফুটবল মহোৎসব দেখবেন। প্রথাগত টিভি সম্প্রচারের পাশাপাশি এবার প্রথমবারের মতো টিকটক এবং ইউটিউবের মতো প্ল্যাটফর্মগুলোতে ম্যাচ বা গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তগুলোর স্ট্রিমিং করার জন্য বিশেষ চুক্তি করা হয়েছে।

ফুটবল বিশ্বকাপ সম্পর্কে সেলিব্রিটিদের মন্তব্য:

আর্জেন্টিনার লিওনেল মেসি জানিয়েছেন, তিনি এই বিশ্বকাপে অংশ নিতে আগ্রহী এবং বর্তমানে প্রতিদিন তিনি শারীরিক অবস্থা পর্যবেক্ষণ করছেন। মেসি বলেন, ‘আমি বিশ্বকাপে থাকতে চাই, যদি আমি শারীরিকভাবে পুরোপুরি ফিট থাকি এবং দলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারি।’

পর্তুগালের ফুটবল কিংবদন্তি ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো নিশ্চিত করেছেন, ২০২৬ বিশ্বকাপই হতে যাচ্ছে তার ক্যারিয়ারের শেষ বিশ্বকাপ। ব্রাজিলের নেইমার এই বিশ্বকাপ নিয়ে খুব আশাবাদী। তিনি বলেন, ‘আমি নিশ্চিতভাবে সেখানে থাকতে চাই। আমি বিশ্বাস করি, উত্তর আমেরিকার এই বিশ্বকাপ ফুটবল দেখার অভিজ্ঞতাই বদলে দেবে।’

ফ্রান্সের কিলিয়ান এমবাপ্পে ইতোমধ্যেই বিশ্বকাপের জন্য নিজেকে প্রস্তুত বলে ঘোষণা করেছেন। তার লক্ষ্য জার্মানির মিরোস্লাভ ক্লোসার সর্বোচ্চ বিশ্বকাপ গোলের রেকর্ড ছোঁয়া এবং ফ্রান্সের হয়ে আবার শিরোপা জেতা।

ইংল্যান্ডের কিংবদন্তি ফুটবলার ডেভিড বেকহ্যাম এই বিশ্বকাপ টুর্নামেন্টের অন্যতম গ্লোবাল অ্যাম্বাসেডর। তিনি মনে করেন যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো এবং কানাডার যৌথ আয়োজন ফুটবলকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যাবে।

গত ৫ ডিসেম্বর টুর্নামেন্টের ফাইনাল ড্র অনুষ্ঠানে কেভিন হার্ট ও হাইডি ক্লার্ম সঞ্চালকের দায়িত্বে ছিলেন এবং সেখানে লিজেন্ডারি গায়ক আন্দ্রে বোচেলি পারফর্ম করেন। এছাড়া টুর্নামেন্টে আটলান্টা শহর প্রতিনিধি হিসেবে র‌্যাপার কিলার মাইক এবং লস অ্যাঞ্জেলেসের অ্যাম্বাসেডর হিসেবে অভিনেত্রী ইভা লংগোরিয়া যুক্ত হয়েছেন।

বিশ্বকাপ টিকিটের দাম ১৩ লাখ টাকা!

বিশ্বকাপ টুর্নামেন্ট দেখার জন্য এখন পর্যন্ত ৩০ লাখের বেশি টিকিট বিক্রি হয়ে গেছে। প্রথম দুই ধাপে প্রায় ২০ লাখ টিকিট বিক্রি হয়েছিল। এরপর গত ফেব্রুয়ারি মাস পর্যন্ত র‌্যান্ডম সিলেকশন ড্র বা লটারি পদ্ধতিতে আরো ১০ লাখের বেশি টিকিট বিক্রি হয়। ১ এপ্রিল ২০২৬ থেকে ‘লাস্ট মিনিট সেলস’ বা শেষ পর্যায়ের টিকিট বিক্রি শুরু হয়েছে। এই ধাপে লটারি নয়, ‘আগে আসলে আগে পাবেন’ ভিত্তিতে ফিফা ডটকম টিকিট পোর্টালে তা পাওয়া যাচ্ছে।

বিশ্বকাপ ফুটবলের টিকিট পাওয়ার জন্য ফিফার কাছে ৫০ কোটি আবেদন জমা পড়েছে, যা একটি বিশ্বরেকর্ড। এই বিশ্বকাপে ১৬টি স্টেডিয়ামে ১০৪টি ম্যাচের জন্য সব মিলিয়ে ৭০ লাখ টিকিট বরাদ্দ করা হয়েছে। এর একটি বড় অংশ সাধারণ দর্শকদের জন্য এবং বাকিগুলো স্পন্সর, হসপিটালিটি ও সদস্য দেশগুলোর জন্য সংরক্ষিত। এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি আবেদন জমা পড়েছে মিয়ামিতে অনুষ্ঠিতব্য কলম্বিয়া বনাম পর্তুগাল ম্যাচ, মেক্সিকো সিটিতে উদ্বোধনী ম্যাচ এবং নিউ ইয়র্ক নিউ জার্সিতে অনুষ্ঠিত ফাইনাল ম্যাচ দেখার জন্য।

টিকিটের সর্বনিম্ন দাম ফিফা নির্ধারণ করেছে ৬০ মার্কিন ডলার বা সাড়ে ৭ হাজার টাকা। গ্রুপ পর্বের ম্যাচে সাধারণ দর্শকদের জন্য ১২০ মার্কিন ডলার বা সাড়ে ১৪ হাজার টাকা। প্লে-অব টুর্নামেন্টের ম্যাচগুলো যারা মেক্সিকোতে দেখবেন তাদের জন্য সাড়ে ১১ ডলার বা ১৫০০ হাজার টাকা থেকে শুরু। সর্বোচ্চ টিকিটের দাম বিশ্বকাপ ফাইনাল ম্যাচের ১৯ জুলাই নিউ ইয়র্ক নিউজার্সি মেটলাইফ স্টেডিয়ামে ১০ হাজার মার্কিন ডলার বা ১৩ লক্ষ টাকার উপরে। #FIFAWorldCup2026 #Football #NorthAmerica2026

#ফিফাবিশ্বকাপ২০২৬ #ফুটবল #উত্তরআমেরিকা #৪৮দল #উদ্বোধনীম্যাচ