Chattogram
১৫ মে, ২০২৬

চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসকের মানবিকতায় শিশু জয়ার চিকিৎসা বিল মওকুফ

চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসকের মানবিকতায় শিশু জয়ার চিকিৎসা বিল মওকুফ

বৃহস্পতিবার রাত ১০টা ৩৪ মিনিটে, চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা সরকারি বাসভবনের কক্ষে বসে দাপ্তরিক ফাইলপত্রে স্বাক্ষর করছিলেন। এক দীর্ঘ কর্মদিবসের পর তখনও তার কাজ শেষ হয়নি। ফাইলের পর ফাইল, সিদ্ধান্তের পর সিদ্ধান্ত – এভাবেই চলছিল তার ব্যস্ততা। এর মাঝেই তিনি মোবাইল ফোনে বিভিন্ন সংবাদ পর্যালোচনা করছিলেন। হঠাৎ একটি শিরোনাম তার দৃষ্টি আকর্ষণ করে – ‘আমরা গরিব মানুষ, ৮০ হাজার দিয়েছি, তবু হাসপাতাল থেকে মেয়েকে ছাড়ছে না।’

একটি শিরোনাম, কয়েকটি বাক্য মাত্র। কিন্তু এর গভীরে লুকিয়ে ছিল এক বাবার আকুতি, এক মায়ের কান্না এবং মৃত্যুর সঙ্গে লড়তে থাকা পাঁচ মাস বয়সী এক শিশুর করুন কাহিনি। শিশুটির নাম জয়া দাস, চার ছেলে সন্তানের পর জন্ম নেওয়া তার পরিবারের একমাত্র আদরের মেয়ে। জেলেপল্লীর এক সাধারণ পরিবারে তার জন্ম। হামে আক্রান্ত হওয়ার পর দীর্ঘদিন ধরে সে হাসপাতালের আইসিইউ ও কেবিনে চিকিৎসাধীন ছিল।

শিশুটির বাবা সুমন জলদাসের ভাষ্যমতে, মেয়ের চিকিৎসার খরচ মেটাতে তিনি তার সব সঞ্চয় শেষ করে ফেলেছেন। এমনকি স্ত্রীর গয়নাও বিক্রি করতে হয়েছে। এছাড়া আত্মীয়-স্বজনের কাছ থেকে ৩০ হাজার টাকা ঋণও নিয়েছেন। সব মিলিয়ে তিনি ৮০ হাজার টাকা জোগাড় করতে পেরেছিলেন। কিন্তু জয়ার চিকিৎসার মোট ব্যয় দাঁড়িয়েছিল ২ লাখ ৩৮ হাজার ৩০২ টাকায়। এই বিপুল পরিমাণ বকেয়া অর্থ পরিশোধের সামর্থ্য তার ছিল না।

অন্যদিকে, হাসপাতালের কেবিনে অপেক্ষারত মায়ের চোখে ছিল নির্ঘুম রাত। চার ছেলের পর পাওয়া এই মেয়েকে বুকে জড়িয়ে তিনি শুধু তাকিয়ে ছিলেন এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে। এই খবরটি হয়তো অনেকের চোখ এড়িয়ে যেতে পারত। কিন্তু সেদিন তা এড়িয়ে যায়নি।

সারা দেশে মানবিক জেলা প্রশাসক হিসেবে পরিচিত মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞার কাছে এটি কেবল একটি হাসপাতালের বিলের গল্প ছিল না। এটি হয়ে দাঁড়িয়েছিল একজন অসহায় মা, একটি নিষ্পাপ শিশু এবং মানবিক দায়িত্ববোধের এক বিরাট প্রশ্ন। খবরটি পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তিনি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেন। এরপর তিনি সরাসরি জেলা সিভিল সার্জন এবং এশিয়ান স্পেশালাইজড হাসপাতালের চেয়ারম্যান লায়ন আলহাজ সালাউদ্দিন আলীর সঙ্গে যোগাযোগ করেন।

জেলা প্রশাসক জাহিদুল ইসলাম বলেন, ‘আজ যদি আমার নিজের পরিবারের কোনো অসুস্থ শিশু চিকিৎসা শেষে শুধু অর্থের অভাবে আটকে যায়, তাহলে কেমন লাগত আমার?’

সংশ্লিষ্ট সূত্র থেকে জানা যায়, প্রয়োজনে বকেয়া বিল জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে পরিশোধ করার বিষয়েও তিনি ইতিবাচক মনোভাব পোষণ করেন। ফোনের ওপার থেকে তাৎক্ষণিক জবাব আসে।

হাসপাতালের চেয়ারম্যান সালাউদ্দিন আলী বলেন, ‘স্যার, আপনি বলেছেন—এটাই যথেষ্ট। বিল কোনো ব্যাপারই না। আপনি সকালে হাসপাতালে আসুন, শিশুটিকে দেখেও যান। আমরাও মানুষের পাশে দাঁড়াতে চাই।’

পরদিন, শুক্রবার সকালে চট্টগ্রামের জিইসি এলাকায় অবস্থিত এশিয়ান স্পেশালাইজড হাসপাতালে পৌঁছান জেলা প্রশাসক। তার সঙ্গে ছিলেন জেলা সিভিল সার্জন ডা. জাহাঙ্গীর আলম, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (এলএ) কামরুজ্জামান, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) শরীফ উদ্দিন এবং জেলা প্রশাসনের অন্যান্য কর্মকর্তারা। এসময় হাসপাতাল চেয়ারম্যান ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারাও উপস্থিত ছিলেন। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে শিশুটির পরিবারকে সহায়তা প্রদান করা হয়।

#চট্টগ্রাম #মানবিকতা #জেলাপ্রশাসক #শিশুচিকিৎসা