National
৯ মার্চ, ২০২৬

ঈদের আগে শিল্পাঞ্চলে শ্রমিক অসন্তোষের আশঙ্কা: ৩০০ কারখানায় বেতন-বোনাস অনিশ্চিত

ঈদের আগে শিল্পাঞ্চলে শ্রমিক অসন্তোষের আশঙ্কা: ৩০০ কারখানায় বেতন-বোনাস অনিশ্চিত

পবিত্র ঈদুল ফিতরকে সামনে রেখে দেশের শিল্পাঞ্চলে, বিশেষ করে তৈরি পোশাক (আরএমজি) ও নন-আরএমজি খাতে, ব্যাপক শ্রমিক অসন্তোষের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। প্রায় ৩০০টি কারখানায় শ্রমিকদের বেতন ও ঈদ বোনাস পরিশোধে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ায় পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। গোয়েন্দা সংস্থা ও প্রশাসনের পর্যবেক্ষণে গাজীপুর, আশুলিয়া এবং চট্টগ্রামের শিল্প বেল্টকে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, যেখানে অন্তত ৬০টি কারখানা গাজীপুরে এবং প্রায় ৩০টি সাভার-আশুলিয়ায় 'অধিক ঝুঁকিপূর্ণ' তালিকায় রয়েছে।

 

অসন্তোষের মূল কারণ:

  • দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক অব্যবস্থাপনা ও শিল্প খাতে চাপ।
  • অনেক কারখানার আর্থিক ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়া।
  • রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের কারণে কিছু মালিকের বিদেশে পাড়ি জমানো এবং ঋণ পরিশোধ না করা।
  • আন্তর্জাতিক বাজারে ওয়ার্ক অর্ডার কমে যাওয়া, কাঁচামালের সংকট এবং এলসি (লেটার অব ক্রেডিট) জটিলতা।
  • মালিকপক্ষের ব্যাংক ঋণ প্রাপ্তিতে জটিলতা ও অভ্যন্তরীণ অব্যবস্থাপনা।

 

গত প্রায় ১৯ মাসে দেশের বিভিন্ন এলাকায় ৩৭৩টি কারখানা স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে গেছে, যার মধ্যে ২৯৯টি তৈরি পোশাক কারখানা। এর ফলে ১ লাখ ৭৩ হাজার ৩৭৪ শ্রমিক কর্মহীন হয়েছেন। বর্তমানে ৭৪৭টি কারখানা জানুয়ারি মাসের বেতন এবং ১৪৯টি কারখানা ডিসেম্বর ও তার আগের মাসের বকেয়া পরিশোধ করেনি। এই বকেয়া এবং ঈদ বোনাসের দাবি শ্রমিকদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। গত ঈদেও একই ধরনের পরিস্থিতি দেখা গিয়েছিল, যেখানে ২৮৭টি কারখানা বোনাস দিতে ব্যর্থ হয় এবং ১,৪৮০টি কারখানা সময়মতো বেতন পরিশোধ করতে পারেনি, যার ফলে ৯৫টি বড় ধরনের অসন্তোষের ঘটনা ঘটে।

 

বাংলাদেশ শ্রম আইন ২০০৬ অনুযায়ী, মাসিক বেতন পরবর্তী মাসের সাত কর্মদিবসের মধ্যে এবং এক বছরের বেশি কর্মরত শ্রমিকদের জন্য অন্তত একটি মূল বেতনের সমপরিমাণ উৎসব বোনাস পরিশোধ করতে হয়। ত্রিপক্ষীয় পরামর্শ পরিষদ ২০ রমজানের মধ্যে বেতন ও বোনাস পরিশোধের তাগিদ দিয়েছে।

 

গোয়েন্দা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বেতন-বোনাস নিয়ে শ্রমিকদের যৌক্তিক দাবিকে পুঁজি করে কিছু 'সুযোগসন্ধানী' শ্রমিক সংগঠন ও স্বার্থান্বেষী মহল পরিস্থিতি উত্তপ্ত করে তুলতে পারে। প্রশাসন কারখানা ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও মহাসড়ক অবরোধের মাধ্যমে সরকারকে প্রশ্নবিদ্ধ করার একটি গভীর ষড়যন্ত্রের আশঙ্কা করছে।

 

সংকট উত্তরণে ১০ দফা সুপারিশ:

  • বকেয়া বেতন দ্রুত পরিশোধ নিশ্চিত করা।
  • সংকটাপন্ন কারখানাগুলোকে স্বল্পমেয়াদি ব্যাংক ঋণ দেওয়া।
  • উসকানিদাতাদের চিহ্নিত করে নজরদারি জোরদার করা।
  • মালিক, শ্রমিক ও সরকারের সমন্বয়ে 'ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্ট' মিটিংয়ের মাধ্যমে সমস্যা সমাধান করা।
  • শিল্পাঞ্চলে পুলিশি টহল ও অতিরিক্ত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা।
  • ঈদের আগে শ্রমিক ছাঁটাই নিরুৎসাহিত করা।
  • অর্ডার বাতিল বা কমার অজুহাতে বেতন আটকে রাখার প্রবণতা বন্ধে মনিটরিং করা।
  • বেতন না দিয়ে মালিকদের কারখানা বন্ধ করে পালিয়ে যাওয়া ঠেকানো।
  • ঢাকা-ময়মনসিংহ, ঢাকা-চট্টগ্রাম ও ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েন রাখা।
  • উৎসবের দিনে কাজ করালে শ্রমিকদের ন্যায্য পাওনা ও বিকল্প ছুটি নিশ্চিত করা।

 

পুলিশ সদর দপ্তরের সহকারী মহাপরিদর্শক (মিডিয়া) এএইচএম শাহাদাত হোসাইন জানিয়েছেন, শিল্পাঞ্চলে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, মালিকপক্ষ ও শ্রমিক নেতাদের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন এবং সরকার সব ধরনের ব্যবস্থা নিচ্ছে।

 

#শ্রমিকঅসন্তোষ #ঈদবোনাস #তৈরিপোশাকশিল্প #শিল্পাঞ্চলসংকট #বেতনবকেয়া