কিয়েভে রাশিয়ার ব্যাপক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে চার, শতাধিক আহত

ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভে রাশিয়ার তরফে চালানো এক বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় অন্তত চারজনের প্রাণহানি ঘটেছে এবং শতাধিক নাগরিক আহত হয়েছেন বলে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত করেছে। চার বছরেরও বেশি সময় ধরে চলমান এই সংঘাতের প্রেক্ষাপটে এই হামলাকে অন্যতম বড় আঘাত হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
রবিবার ভোরের আলো ফোটার আগ পর্যন্ত কিয়েভের আকাশ কাঁপিয়ে একের পর এক বিস্ফোরণের শব্দ প্রতিধ্বনিত হয়েছে। আতঙ্কে শহরবাসী ভূগর্ভস্থ মেট্রো স্টেশনগুলোতে আশ্রয় নিয়েছেন। দিনের আলোয় উদ্ধারকর্মীরা ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় আগুন নেভানো এবং ধ্বংসস্তূপ সরানোর কাজে নিয়োজিত হন। এই হামলায় আবাসিক ভবন, শপিং মল, জাদুঘর, থিয়েটার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ অসংখ্য স্থাপনা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
রাশিয়ান সেনাবাহিনী দাবি করেছে যে, তারা এই অভিযানে পারমাণবিক অস্ত্র বহনযোগ্য হাইপারসনিক ‘ওরেশনিক’ ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করেছে। তবে তারা আরও জানিয়েছে যে, এই ক্ষেপণাস্ত্রগুলোতে পারমাণবিক ওয়ারহেড সংযুক্ত ছিল না।
এই হামলার পূর্বে, রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন রুশ-নিয়ন্ত্রিত পূর্ব ইউক্রেনের একটি কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ইউক্রেনীয় বাহিনীর হামলায় ২১ জন নিহতের ঘটনার প্রতিশোধ নেওয়ার হুমকি দিয়েছিলেন।
কিয়েভের বাসিন্দা ২১ বছর বয়সী সোফিয়া মেলনিচেঙ্কো জানিয়েছেন, মেট্রো স্টেশনে আশ্রয় নেওয়ার পরও তিনি নিজেকে নিরাপদ মনে করতে পারেননি। তিনি ঘটনার বিবরণ দিয়ে বলেন, “তিনটি বড় বিস্ফোরণের পর চতুর্থ বিস্ফোরণে মেট্রো স্টেশনের ছাদ ভাঙতে শুরু করে। চারদিকে এক ভয়াবহ বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়, শিশুরা কান্নাকাটি শুরু করে এবং মানুষের মধ্যে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।”
ইউক্রেনের বিমান বাহিনী সূত্রে জানা গেছে, এই হামলায় প্রায় ৬০০টি ড্রোন এবং ৯০টি ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছিল। এর মধ্যে ৫৪৯টি ড্রোন এবং ৫৫টি ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করতে সক্ষম হয়েছে ইউক্রেনীয় বাহিনী।
ইউরোপীয় নেতারা এই হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডার লেয়েন মন্তব্য করেছেন, “নিরীহ বেসামরিক জনগণের উপর সন্ত্রাস চালানো কোনো শক্তির পরিচয় নয়, বরং এটি গভীর হতাশার প্রতিফলন।” ফরাসি প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রোঁ এই হামলাকে “রাশিয়ার আগ্রাসী যুদ্ধের অচলাবস্থার একটি প্রকাশ” হিসেবে অভিহিত করেছেন। অন্যদিকে, জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মেরৎস ‘ওরেশনিক’ ক্ষেপণাস্ত্রের ব্যবহারকে “বেপরোয়া উত্তেজনা বৃদ্ধি” বলে বর্ণনা করেছেন।
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি পশ্চিমা দেশগুলোর কাছে আরও শক্তিশালী আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সহায়তার জন্য জরুরি আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি জোর দিয়ে বলেছেন, “শুধু সমর্থনের আশ্বাস যথেষ্ট নয়, এখন বাস্তব পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহ কোনোভাবেই একদিনের জন্যও বন্ধ রাখা যাবে না।”
অন্যদিকে, রাশিয়া দাবি করেছে যে তারা ইউক্রেনীয় সেনাবাহিনী এবং গোয়েন্দা বাহিনীর কমান্ড পোস্টগুলোকে লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে। তবে কিয়েভের মেয়র ভিতালি ক্লিচকো নিশ্চিত করেছেন যে, রাজধানী শহরের প্রতিটি জেলাতেই ক্ষয়ক্ষতির ঘটনা ঘটেছে।
এই হামলার ফলে আলবেনিয়ার রাষ্ট্রদূতের বাসভবনও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর প্রতিবাদে আলবেনিয়া রাশিয়ার রাষ্ট্রদূতকে তলব করেছে। জার্মান সংবাদমাধ্যম এআরডি (ARD) এবং ডয়চে ভেল (Deutsche Welle)-এর অফিসও হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো জানিয়েছে। তবে সৌভাগ্যবশত, হামলার সময় উভয় ভবনেই কেউ উপস্থিত ছিলেন না।
কিয়েভ ছাড়াও, খারকিভ, চেরকাসি এবং দনিপ্রোপেত্রোভস্ক অঞ্চলেও এই হামলা চালানো হয়েছে।
#ইউক্রেন #রাশিয়া #কিয়েভ #ক্ষেপণাস্ত্রহামলা #ড্রোনহামলা #যুদ্ধ