রেল দুর্ঘটনা: অরক্ষিত লেভেল ক্রসিং ও জনবল সংকট মৃত্যু মিছিলের প্রধান কারণ

ট্রেনের হুইসেল বাজছে, কিন্তু রেলগেট নামানো হয়নি। বাঁশের আড়কাঠি সরিয়ে একটি মাইক্রোবাস সরাসরি রেললাইনে উঠে পড়ায় মুহূর্তের মধ্যে সেটি ট্রেনের সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। এরপর কেবলই চিৎকার, আতঙ্ক আর নিস্তব্ধতা। দেশের তিন হাজার কিলোমিটার রেলপথ জুড়ে থাকা ক্রসিংগুলোর এমন চিত্র এখন প্রায় নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে।
রেলওয়ে পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বিগত এক দশকে রেল দুর্ঘটনায় মোট ৯ হাজার ২৩৭ জন মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। এর অর্থ হলো, গড়ে প্রতিদিন প্রায় তিনজন ব্যক্তি রেল দুর্ঘটনায় মৃত্যুবরণ করছেন। এই দুর্ঘটনার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ ঘটে ঈদযাত্রার সময়। আসন্ন ঈদকে সামনে রেখে দেশের অবৈধ ও অরক্ষিত লেভেল ক্রসিংগুলো আবারও নতুন করে উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে।
রেলওয়ে প্রকৌশল বিভাগের প্রাপ্ত তথ্যমতে, দেশে বৈধ ও অবৈধ মিলিয়ে তিন হাজারের অধিক লেভেল ক্রসিং বিদ্যমান রয়েছে, যা প্রায় তিন হাজার কিলোমিটার রেলপথে বিস্তৃত। তবে, এসব লেভেল ক্রসিংয়ের অর্ধেকেরও কম স্থানে গেটম্যানের উপস্থিতি রয়েছে। জনবল ঘাটতির কারণে বেশিরভাগ ক্রসিং কার্যত অরক্ষিত অবস্থায় পরিচালিত হচ্ছে। রেলওয়ের নিজস্ব হিসাব অনুযায়ী, রেল দুর্ঘটনায় যত প্রাণহানি ঘটে, তার ৮৯ শতাংশই হয়ে থাকে এই অরক্ষিত লেভেল ক্রসিংগুলোতে।
গেটকিপারের ভয়াবহ সংকট
রেলের পূর্বাঞ্চলে মোট ৭২৯টি বৈধ ক্রসিংয়ের বিপরীতে ৭৫৯টি অবৈধ ক্রসিং রয়েছে। ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলপথ সহ ঢাকাকেন্দ্রিক রুটগুলোতে অবৈধ ক্রসিংয়ের সংখ্যা বিশেষভাবে বেশি। পূর্বাঞ্চলের ৩৪৩টি বৈধ ক্রসিংয়ের মধ্যে ১৮৯টিতে কোনো গেটকিপার নেই, যা অর্ধেকেরও বেশি বৈধ ক্রসিংকে পাহারাদারশূন্য করে রেখেছে। পশ্চিমাঞ্চলেও একই রকম উদ্বেগজনক পরিস্থিতি বিরাজ করছে, যেখানে ৯৭৮টি ক্রসিংয়ের মধ্যে ৭৫৭টিতেই কোনো গেটম্যান নেই।
সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১৪ সাল থেকে দেশে মোট ৮৬৮টি রেল দুর্ঘটনা ঘটেছে, যেখানে ১১১ জন নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে শুধুমাত্র লেভেল ক্রসিংয়ে হওয়া ৯৬টি দুর্ঘটনায় ৯৯ জনের জীবনহানি হয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এই পরিসংখ্যান অসম্পূর্ণ, কারণ রেললাইন পারাপারের সময় নিহত পথচারীদের অনেক ঘটনাই সরকারি হিসাবের আওতার বাইরে থেকে যায়।
বেসরকারি সংস্থা রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুসারে, ২০১৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত রেল দুর্ঘটনায় কমপক্ষে এক হাজার ২৬৯ জন মারা গেছেন। অন্যদিকে, রেল মন্ত্রণালয়ের নিজস্ব হিসাবে গত ১০ বছরে লেভেল ক্রসিংয়ে ২৬৩ জন প্রাণ হারিয়েছেন। এছাড়াও, ২০২৫ সালের প্রথম ছয় মাসে ৪৭ জনের প্রাণহানি হয়েছে।
কুমিল্লা ও লাকসামে মৃত্যুর মিছিল
লাকসাম রেলওয়ে থানা সূত্র জানিয়েছে, বিগত পাঁচ বছরে ট্রেনে কাটা পড়ে, যানবাহনের সঙ্গে সংঘর্ষে অথবা অসতর্কভাবে রেললাইন পার হতে গিয়ে অন্তত ৩৫৫ জন নিহত হয়েছেন। বছর অনুযায়ী ২০২২ সালে ৭১ জন, ২০২৩ সালে ৬৮ জন, ২০২৪ সালে ৭০ জন এবং ২০২৫ সালে ৭৫ জন নিহত হয়েছেন। চলতি বছরের মার্চ মাস পর্যন্ত এই সংখ্যা আরও ৩০ জন বৃদ্ধি পেয়েছে।
ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলপথের কুমিল্লা অংশে গত ছয় বছরে ৩৪৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। এই অঞ্চলের ১৮৬ কিলোমিটার রেলপথে ১১৬টি অবৈধ লেভেল ক্রসিং রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ২০২০ সালে করোনা মহামারীর কারণে দুর্ঘটনা কিছুটা কমলেও পরবর্তীতে পরিস্থিতি আবার ভয়াবহ আকার ধারণ করে। ২০২৫ সালে সর্বোচ্চ ৭৫-এ পৌঁছেছে, যা স্পষ্টতই প্রমাণ করে পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি, বরং অবনতি ঘটেছে।
সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ রুট
রেলের পরিবহন ব্যবস্থা দেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ, কিন্তু অরক্ষিত লেভেল ক্রসিং এবং গেটম্যানের অভাব ক্রমাগত মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। এই সমস্যা সমাধানে জরুরি ভিত্তিতে পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন। #রেলদুর্ঘটনা #লেভেলক্রসিং #নিরাপত্তা #বাংলাদেশরেলওয়ে