Environment
১ মার্চ, ২০২৬

শীতলক্ষ্যা নদী দূষণ : শিল্প-কারখানার বিষাক্ত বর্জ্যে বিপন্ন নদীর জীবন

শীতলক্ষ্যা নদী দূষণ : শিল্প-কারখানার বিষাক্ত বর্জ্যে বিপন্ন নদীর জীবন

নরসিংদীর শীতলক্ষ্যা নদীতে গত কয়েক দিন ধরে বিপুল পরিমাণ মাছ মরে ভেসে উঠছে, যা স্থানীয় বাসিন্দা ও জেলেদের মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। প্রতি বছরের মতো এবারও শীতকালের শেষে নদীর পানি কমে আসার সময়ে এই চিত্র দেখা যাচ্ছে। যদিও প্রাথমিকভাবে মরা মাছ সংগ্রহে স্থানীয়দের মধ্যে সাময়িক আনন্দ দেখা গেছে, তবে নদীর ভবিষ্যৎ মাছশূন্য হওয়ার আশঙ্কায় তারা শঙ্কিত।

এই গণহারে মাছ মরার প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে নদীর দুই তীরের কলকারখানার বিষাক্ত বর্জ্য ও রাসায়নিক পদার্থ। বছরের পর বছর ধরে শিল্পবর্জ্য নদীতে মিশে পানিকে দূষিত করছে, যা নদীর জীববৈচিত্র্যকে মারাত্মকভাবে হুমকির মুখে ফেলছে। একসময় দেশীয় মাছের অন্যতম ভান্ডার হিসেবে পরিচিত শীতলক্ষ্যা নদী থেকে এখন বিভিন্ন প্রজাতির মাছ হারিয়ে যাচ্ছে। মৎস্য অফিসের তথ্য অনুযায়ী, একসময় শীতলক্ষ্যার গাজীপুর ও নরসিংদী অংশ থেকে বছরে ৫০০ মেট্রিক টন মাছের সরবরাহ পাওয়া যেত।

স্থানীয়দের অভিযোগ, ময়মনসিংহ জেলার ভালুকা উপজেলার শিল্পকারখানার বিষাক্ত তরল বর্জ্য ক্ষিরু ও মাটিকাটা নদীর মাধ্যমে শীতলক্ষ্যায় পতিত হয়ে পানিকে কালো ও তীব্র দুর্গন্ধযুক্ত করে তুলছে। এছাড়া গাজীপুরের কালীগঞ্জ ও কাপাসিয়া উপজেলার কিছু কারখানার বর্জ্যও এই দূষণের জন্য দায়ী। নদীর পাড়ে অবস্থিত অনেক বৃহৎ শিল্পকারখানায় বর্জ্য শোধনের ব্যবস্থা (ইটিপি) থাকলেও রাতের আঁধারে তা বন্ধ রাখা হয়, আবার অনেক প্রতিষ্ঠানে ইটিপি না থাকায় বর্জ্য সরাসরি নদীতে ফেলা হচ্ছে। এর ফলে নদীর পানি কোথাও লাল আবার কোথাও কালচে বর্ণ ধারণ করছে।

মরে ভেসে ওঠা মাছগুলোর মধ্যে রুই, কাতল, বোয়াল, আইড়, পাঙাশসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছ রয়েছে। স্থানীয় জেলেরা জানান, অধিকাংশ মরা মাছের পেটেই ডিম পাওয়া যাচ্ছে এবং সেগুলোতে দূষিত কেমিক্যালের গন্ধ পাওয়া যায়। শৈশব থেকে শীতলক্ষ্যায় মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করা সুলতানপুর গ্রামের অতিন্দ্র চন্দ্র বর্মন জানান, একসময় শীতলক্ষ্যায় চিংড়ি, বাউশ, বাইম, রিঠা, বোয়ালসহ শত প্রজাতির মাছের অবাধ ভান্ডার ছিল, যা এখন বিষাক্ত বর্জ্যের কারণে বিলুপ্তির পথে।

জীবন ও প্রকৃতি ফাউন্ডেশনের সভাপতি সরোয়ার পাঠান উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, নদীর পানিতে অক্সিজেনের সংকট তৈরি হওয়ায় মাছসহ জলজ প্রাণীরা বসবাসের উপযুক্ত পরিবেশ হারাচ্ছে। তিনি শিল্পকারখানার দূষণ বন্ধ করার উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান। নরসিংদী জেলা পরিবেশ অধিদপ্তরের উপপরিচালক বদুরুল হুদা জানিয়েছেন, গাজীপুর জেলার কালীগঞ্জ ও কাপাসিয়া উপজেলার কিছু কারখানার দূষিত কেমিক্যালের কারণে মাছ মারা যাচ্ছে বলে জানা গেছে এবং তাদের অফিস থেকে সংশ্লিষ্ট উপজেলাগুলোতে কারখানা পরিদর্শনের জন্য চিঠি দেওয়া হবে। তবে নদী রক্ষায় পরিবেশবাদী আন্দোলনকারীদের উদ্যোগ থাকলেও প্রশাসনের জোরালো পদক্ষেপের অভাব রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।