প্রযুক্তি
২৫ মে, ২০২৬

টেকনাফ সীমান্ত: রোহিঙ্গা-স্থানীয় অপরাধীদের 'অশুভ আঁতাত' জাতীয় নিরাপত্তার জন্য নতুন হুমকি

টেকনাফ সীমান্ত: রোহিঙ্গা-স্থানীয় অপরাধীদের 'অশুভ আঁতাত' জাতীয় নিরাপত্তার জন্য নতুন হুমকি

কক্সবাজারের টেকনাফ সীমান্ত কেবল মনোরম প্রাকৃতিক দৃশ্যের জন্যই পরিচিত নয়, এটি বর্তমানে জাতীয় নিরাপত্তার জন্য এক জটিল চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। বাহারছড়া, হ্নীলা এবং হোয়াইক্যংয়ের দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলকে কেন্দ্র করে স্থানীয় অপরাধী গোষ্ঠী এবং রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীদের মধ্যে গড়ে ওঠা 'অশুভ আঁতাত' সীমান্ত নিরাপত্তাকে গুরুতর ঝুঁকির মুখে ফেলেছে। এই অপরাধী চক্র ভূপ্রকৃতিকে তাদের আড়াল হিসেবে ব্যবহার করে টেকনাফকে অপহরণ এবং মানব পাচারের এক অন্ধকার রাজ্যে পরিণত করেছে।

টেকনাফের এই সংকটজনক পরিস্থিতির মূলে রয়েছে অপরাধীদের এক অভিনব 'হাইব্রিড মডেল'। স্থানীয় অপরাধীরা এই অঞ্চলের পাহাড়ি পথ, গোপন সুড়ঙ্গ এবং সাধারণ মানুষের চলাচলের বিষয়ে গভীর জ্ঞান রাখে। তারা মূলত 'গাইড' এবং 'ইনফরমার' হিসেবে কাজ করে। অন্যদিকে, উগ্রপন্থী রোহিঙ্গা গোষ্ঠীগুলো তাদের জনবল এবং আধুনিক অস্ত্র সরবরাহ নিশ্চিত করে। তাদের জন্য এই পাহাড়গুলো কেবল লুকিয়ে থাকার স্থানই নয়, বরং অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের প্রশিক্ষণের কেন্দ্রও বটে। এই দুটি পক্ষের সমন্বয়ে গঠিত ১০ থেকে ১২টি সশস্ত্র দল বর্তমানে পুরো টেকনাফ উপকূল জুড়ে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছে। স্থানীয় এবং রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীদের এই 'অশুভ আঁতাত' টেকনাফের জনজীবনকে এক দীর্ঘস্থায়ী দুঃস্বপ্নে পরিণত করেছে। এই দুইয়ের সম্মিলিত প্রভাবে পাহাড়ী অঞ্চলটি কার্যত এক সমান্তরাল রাজ্যে পরিণত হয়েছে।

প্রতিটি অপরাধী আস্তানায় ল্যাপটপ এবং বড় আকারের মোবাইল রাউটার দেখা যায়। সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহার করে এগুলো সার্বক্ষণিক চালু রাখা হয়, যার মাধ্যমে তারা নিয়মিত তথ্য আদান-প্রদান করে। যদি কোনো অপহৃতের পরিবার পুলিশ বা গণমাধ্যমের সাহায্য নেয়, তবে সন্ত্রাসীরা তাৎক্ষণিকভাবে ল্যাপটপের মাধ্যমে সেই তথ্য পেয়ে যায়। এর ফলে, অপহৃত ব্যক্তির উপর নির্যাতনের মাত্রা বহুগুণ বেড়ে যায়। যারা অপহরণকারীদের হাত থেকে মুক্তি পেয়েছে, তাদের অভিজ্ঞতা অত্যন্ত ভীতিজনক।

পাহাড়ের দুর্গম চূড়ায় সন্ত্রাসীরা অত্যাধুনিক সুযোগ-সুবিধা সহ আস্তানা তৈরি করেছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কার্যকলাপ পর্যবেক্ষণ করার জন্য তারা শক্তিশালী দূরবীণ যন্ত্র এবং উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করে।

অপহরণ এই অঞ্চলে একটি নৈমিত্তিক ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত যৌথ বাহিনীর অভিযানে বিপুল সংখ্যক মানুষকে উদ্ধার করা হলেও সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক কমেনি। মুক্তিপণ আদায়কে পেশা হিসেবে বেছে নেওয়ায় সাধারণ কৃষক এবং দিনমজুররা এখন পাহাড়ে কাজ করতে ভয় পাচ্ছেন। প্রান্তিক কৃষকদের কাছে পাহাড় এখন এক অভিশপ্ত স্থান। যখনই ফসল ঘরে তোলার সময় আসে, তখনই পাহাড় থেকে সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা নেমে আসে। অস্ত্রের মুখে তারা কৃষকদের ফসল তুলতে নিষেধ করে। সন্ত্রাসীদের নির্দেশ অমান্য করলে ২০-২৫ জনের একটি সশস্ত্র দল এসে কৃষকদের জিম্মি করে পাহাড়ে নিয়ে যায়। এরপর জিম্মি কৃষকদের পরিবারের কাছে ফোন করে আকাশছোঁয়া মুক্তিপণ দাবি করা হয়। টাকা দিতে ব্যর্থ হলে তাদের উপর অমানবিক নির্যাতন চালানো হয়, এবং অনেক ক্ষেত্রে তাদের লাশ গভীর জঙ্গলে পাওয়া যায়।

অপহৃতদের আস্তানায় আটকে রেখে নির্যাতনের দৃশ্য ধারণ করে পরিবারের কাছে পাঠানো হচ্ছে, যা স্থানীয় জনগণের মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব ফেলছে। সীমান্ত এলাকায় অপরাধীদের এই শক্তিশালী অবস্থান এবং তাদের কার্যক্রম জাতীয় নিরাপত্তার জন্য একটি গুরুতর উদ্বেগের বিষয়। #টেকনাফসংকট #সীমান্তনিরাপত্তা #রোহিঙ্গাঅপরাধ #মানবপাচার #মুক্তিপণ