Chattogram
১৪ মে, ২০২৬

ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় খাল দখল ও ভরাট: আলীয়াবাদ বিলের পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় কৃষকদের দুর্ভোগ

ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় খাল দখল ও ভরাট: আলীয়াবাদ বিলের পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় কৃষকদের দুর্ভোগ

দখল এবং খননের অভাবে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর উপজেলার আলীয়াবাদ বিলের খালটি এখন মৃতপ্রায়, যা কার্যত একটি ড্রেনে পরিণত হয়েছে। এই খালের পানি নিষ্কাশনের পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিলের বিস্তীর্ণ ইরি-বোরো ধানের ফসলি জমি প্রায়শই জলমগ্ন থাকে। শুষ্ক মৌসুমে যখন পানির অভাব দেখা দেয়, তখন এলাকার শত শত কৃষককে সেচ কাজের জন্য চরম ভোগান্তির শিকার হতে হয়।উপজেলার শ্রীরামপুর মৌজার ২৪৫ নম্বর দাগে খাস খতিয়ানভুক্ত এই খালটি জেলা ভূমি রেকর্ড ও জরিপ (এলএ) শাখায় কুট্টাপাড়া ফিসারি জলমহল নামে পরিচিত। যদিও সরকারি নকশা অনুযায়ী এর দৈর্ঘ্য প্রায় ২ হাজার ৪০০ ফুট এবং প্রস্থ ৬০ থেকে ১০০ ফুট হওয়ার কথা, সরেজমিনে দেখা যায় এর বর্তমান অবস্থা শোচনীয়—মাত্র তিন-চার ফুট প্রশস্ত একটি ড্রেনে পরিণত হয়েছে এটি।ঐতিহাসিকভাবে, খালটি বুড়ি নদী থেকে উৎপন্ন হয়ে মাঝিকাড়া ও আলীয়াবাদ গ্রামের উত্তর পাশ দিয়ে প্রবাহিত হয়ে ভাটা নদীতে পতিত হত। ১৯৭৯ সালে, প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এই খালের পাশ দিয়ে হেঁটে ভাটা নদী খনন প্রকল্পের উদ্বোধন করেছিলেন। সেই সময়ে তিনি মাথায় সাদা টুপি, পরনে সাদা গেঞ্জি এবং হাতে মাটি কাটার কোদাল নিয়ে এই খালের পাড়ে বসে কিছুটা বিশ্রামও নিয়েছিলেন।স্থানীয় জরিপ অনুযায়ী, শতবর্ষী এই খালটির দৈর্ঘ্য প্রায় ২ হাজার ৪০০ ফুট এবং প্রস্থ ৬০ থেকে ৮০ ফুট, যা কিছু স্থানে ১০০ ফুট পর্যন্ত বিস্তৃত। কিন্তু বিগত কয়েক দশক ধরে এর খনন কাজ না হওয়ায় খালটি অবাধে দখল হয়ে গেছে এবং জমির সঙ্গে সমান্তরালভাবে ভরাট করা হয়েছে। এর ফলে খালটি তার পরিচিতি হারিয়ে একটি সরু ড্রেনে পরিণত হয়েছে।পানি চলাচল সম্পূর্ণরূপে বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সামান্য বৃষ্টিতেই বিলটি জলাবদ্ধতার শিকার হয়, যা ফসল নষ্ট করে দেয়। বর্ষাকালে পর্যাপ্ত স্রোত না থাকার কারণে বিলের পানি দূষিত হয়ে পড়ে এবং কচুরিপানায় ভরে যায়। এই নোংরা পানিতে নামলে চুলকানি সহ বিভিন্ন ধরনের চর্মরোগ ও সংক্রমণের ঝুঁকি দেখা দেয়। বিলের মাছ সহ অন্যান্য জলজ উদ্ভিদ ও প্রাণীও মারা যাচ্ছে।স্থানীয় জেলেদের মতে, বর্ষা ও শুষ্ক উভয় মৌসুমেই এই খালটি মাছে পরিপূর্ণ থাকত এবং মাছ বিক্রি করেই তাদের জীবিকা চলত। খালটি বিলুপ্তির পথে চলে যাওয়ায় এখন তাদের সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে।আলীয়াবাদ গ্রামের বাসিন্দা এবং বীর মুক্তিযোদ্ধা আবদুল মান্নান স্মৃতিচারণ করে বলেন, \"আমার বাবা সারা বছর এই খাল থেকে মাছ ধরতেন। ছোটবেলায় আমরাও এখানে মাছ ধরতাম এবং সাঁতার কাটতাম। খালটি মাছে পরিপূর্ণ থাকত এবং বিলের সমস্ত মাছ এই খালের মাধ্যমে অন্যত্র চলে যেত।\" তিনি আরও যোগ করেন, খালের পাড়ে অনেকেই গরু চরাতেন, গোসল করাতেন। আবার অনেকে খালপাড়ে পেঁয়াজ, রসুন, মরিচ এবং বিভিন্ন ধরনের সবজি চাষ করতেন। বর্ষাকালে পালতোলা নৌকা চলত, মাঝি-মাল্লাদের গান শোনা যেত। এই খালের সাথে অনেক স্মৃতি জড়িয়ে আছে। এখন দেখে বোঝার উপায় নেই যে, এখানে একসময় একটি খরস্রোতা খাল ছিল।\"আলীয়াবাদ গ্রামের প্রবীণ বাসিন্দা জহিরুল হক সর্দার জানান, আলীয়াবাদ, মাঝিকাড়া এবং নবীনগর শহরের বেশিরভাগ এলাকার বৃষ্টির পানি নিষ্কাশনের অন্যতম প্রধান মাধ্যম ছিল এই খাল। তিনি বলেন, স্বাধীনতার আগে করিম চেয়ারম্যানের উদ্যোগে একবার খনন কাজ হয়েছিল। এরপর তেমনভাবে খনন না হওয়ায় যে যার মতো করে খালের পাড় কেটে খাল ভরাট করে জমির সঙ্গে সমান্তরাল করে ফেলেছে। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, বিভিন্ন সময় শুনেছি, কেউ কেউ নাকি খালের জায়গা লিজ নিয়ে এসেছে।\"আলীয়াবাদ গ্রামের বাসিন্দা ইউনুস আলী, ইকবাল হোসেন বসু, হুমায়ুন কবির, মাসুদ করিম
#আলীয়াবাদবিল #নবীনগরখাল #ব্রাহ্মণবাড়িয়া