Chattogram
৭ মার্চ, ২০২৬
কক্সবাজারে রেললাইনের জমি অধিগ্রহণে ২ কোটি টাকা আত্মসাৎ: ৬ বছরেও দুদকের তদন্ত প্রতিবেদন নেই, প্রশ্ন ভুক্তভোগীদের

কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের ভূমি অধিগ্রহণ (এলএ) শাখায় রেললাইনের জমি অধিগ্রহণের ক্ষতিপূরণের প্রায় দুই কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগের তদন্তে দীর্ঘসূত্রতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ছয় বছরেও আদালতে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করতে পারেনি। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, প্রভাবশালী সরকারি কর্মকর্তাদের রক্ষা করতেই ইচ্ছাকৃতভাবে তদন্তে বিলম্ব করা হচ্ছে।
মামলার বিবরণ ও অভিযোগ:
- ২০২০ সালে রামু উপজেলার ফতেখাঁরকুল ইউনিয়নের লম্বরীপাড়া এলাকার ২০টি হতদরিদ্র পরিবারের ক্ষতিপূরণের টাকা জাল স্বাক্ষরের মাধ্যমে উত্তোলনের অভিযোগে জাহানারা বেগম নামে এক ভুক্তভোগী মামলা করেন।
- মামলায় কক্সবাজারের তৎকালীন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) আশরাফুল আফছার, ভূমি অধিগ্রহণ কর্মকর্তা আবু হাসনাত, অতিরিক্ত ভূমি অধিগ্রহণ কর্মকর্তা দেবতোষ চক্রবর্তী, কানুনগো মোখলেছুর রহমান, সার্ভেয়ার মাসুদ রানা, দালাল শাহজাহান ও শামসুল আলমসহ ১৮ জনকে আসামি করা হয়।
- বাদীপক্ষের দাবি, জমির মালিকানা নিয়ে আদালতে মামলা চলমান থাকায় ক্ষতিপূরণের টাকা বিতরণে নিষেধাজ্ঞা ছিল। সেই আদেশ অমান্য করে এলএ অফিসের কিছু কর্মকর্তা ও দালালচক্রের যোগসাজশে জাল স্বাক্ষরের মাধ্যমে চেক ইস্যু করে টাকা তুলে নেওয়া হয়।
তদন্তে দীর্ঘসূত্রতা ও অনিয়ম:
- মামলার পর তদন্তে বিপুল পরিমাণ নথিপত্র ও জাল কাগজপত্র জব্দ করা হয় এবং কয়েকজনকে আটকও করা হয়।
- অভিযোগ রয়েছে, সরকারি কর্মকর্তাদের সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ মিললেও তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে কেবল বদলি করা হয়েছে।
- দুদকের এ মামলায় ইতোমধ্যে তিনজন তদন্ত কর্মকর্তা বদলি হয়েছেন, কিন্তু ছয় বছরেও কোনো তদন্ত কর্মকর্তা আদালতে প্রতিবেদন জমা দেননি।
২০ পরিবারের টাকা এক পরিবারের হাতে:
- আরএস ৯৮ খতিয়ান অনুযায়ী মৃত জীবন আলীর প্রায় ২০টি ওয়ারিশ পরিবার থাকলেও, অভিযোগ উঠেছে যে প্রায় দুই কোটি টাকার ক্ষতিপূরণ উত্তোলন করেছেন শুধু মনির উদ্দিনের ছেলে মোহাম্মদ কালুর ওয়ারিশরা।
- নুরুল হক, ইব্রাহিম খলিল, রাশেদা বেগম ও আনোয়ারা বেগমের নামে চারটি পৃথক চেকে এই টাকা তোলা হয়।
- আদালতের নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও জাল আম-মোক্তারনামা তৈরি করে এলএ শাখার কর্মকর্তা-কর্মচারী ও দালালচক্রের সহায়তায় এই টাকা উত্তোলন করা হয়েছে বলে অভিযোগ।
প্রতারণার অভিযোগ ও দুদকের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন:
- ক্ষতিপূরণের টাকা পাওয়ার তালিকায় নাম থাকা সত্ত্বেও নুরুল হক নিজেই জালিয়াতির অভিযোগ করেছেন। তার দাবি, দালালচক্র আশ্বাস দিয়েছিল সব ওয়ারিশ টাকা পাবেন, কিন্তু বাস্তবে কেবল মনির উদ্দিনের বংশধররাই টাকা পেয়েছেন।
- তিনি আরও অভিযোগ করেন, চেক ইস্যুর আগেই দালাল শাহজাহানসহ সংশ্লিষ্টদের কাছে প্রায় এক কোটি ১০ লাখ টাকা ‘অগ্রিম’ হিসেবে চলে যায়, ফলে মোহাম্মদ কালুর ওয়ারিশদের হাতে আসে মাত্র ৯০ লাখ টাকা।
- মামলার বাদীপক্ষের আম-মোক্তার ওসমান গণি অভিযোগ করেছেন যে, দুদক কর্মকর্তা তাফছির বিল্লাহকে জালিয়াতির মাধ্যমে টাকা উত্তোলন ও ঘুষ-বাণিজ্যে জড়িত কর্মকর্তাদের অডিও রেকর্ড দেওয়া হলেও প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়নি।
- আদালতের নির্দেশ সত্ত্বেও বর্তমান তদন্ত কর্মকর্তা অনিক বড়ুয়া নির্ধারিত সময়ে প্রতিবেদন জমা দেননি। ওসমান গণি অভিযোগ করেন, সরকারি কর্মকর্তাদের রক্ষা করতেই তদন্তে বিলম্ব করা হচ্ছে এবং তদন্ত কর্মকর্তা ইউনিয়ন পরিষদকে মিথ্যা তথ্য দিতে চাপ প্রয়োগ করেছেন।
বাদীপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট টুটুল পাল জানান, ছয় বছর ধরে দুদক মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দিচ্ছে না, যা অস্বাভাবিক। ভুক্তভোগীরা আদালতের দ্বারে দ্বারে ঘুরতে ঘুরতে নিঃস্ব হয়ে পড়েছেন।