ময়মনসিংহে ডেঙ্গু পরিস্থিতি উদ্বেগজনক: আগাম প্রস্তুতি ও চ্যালেঞ্জ

ময়মনসিংহে ডেঙ্গু পরিস্থিতি আবারও ভয়াবহ রূপ নেওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে, যা স্থানীয় প্রশাসন ও স্বাস্থ্য বিভাগের মধ্যে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। বর্ষা মৌসুম শুরুর আগেই ডেঙ্গু রোগী শনাক্তের হার বৃদ্ধি পাওয়ায় আগাম প্রস্তুতির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
পরিসংখ্যান ও উদ্বেগ:
- গত বছরের চিত্র: গত বছর জেলায় ৩,২১৯ জন ডেঙ্গুরোগী শনাক্ত হয়েছিল। এর মধ্যে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ২,৯৭৫ জন এবং উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতালে ২৪৪ জন চিকিৎসা নেন। ৫০-৬০ বছর বয়সী রোগীদের মধ্যে মৃত্যুর হার বেশি ছিল এবং নান্দাইল উপজেলায় আক্রান্তের সংখ্যা ছিল সর্বাধিক।
- চলতি বছরের প্রবণতা: চলতি বছরের ১৩ মার্চ পর্যন্ত জেলায় ২৮ জন ডেঙ্গুরোগী শনাক্ত হয়েছে, যার মধ্যে ২১ জন ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এবং ৭ জন উপজেলা হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতামত ও চ্যালেঞ্জ:
- বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কীটতত্ত্ব বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ মহির উদ্দীন জানান, বাসাবাড়ির আশেপাশে জমে থাকা ছোট পাত্রের পানি, নির্মাণাধীন ভবনের গর্ত, ফুলের টব ও পরিত্যক্ত টায়ার এডিস মশার প্রধান প্রজননস্থল। ডেঙ্গু মশার ডিম ৮-৯ মাস পর্যন্ত জীবিত থাকতে পারে এবং বৃষ্টির সংস্পর্শে দ্রুত লার্ভায় পরিণত হয়।
- ফগিং কার্যক্রমের সঠিক সময় (সকাল ৭টার আগে ও বিকাল ৫টার পর) এবং ওষুধের সঠিক মাত্রা অনুসরণ না করায় এর কার্যকারিতা কমে যাচ্ছে।
- অধ্যাপক ড. কাজী শাহানারা আহমেদ উল্লেখ করেন, অদক্ষ কর্মীদের দ্বারা স্প্রে করার ফলে মশা নিধন না হয়ে বরং প্রতিরোধী হয়ে উঠছে।
কীটনাশকের কার্যকারিতা ও সিন্ডিকেট:
- ডেঙ্গু প্রতিরোধে ব্যবহৃত লার্ভিসাইড বিটিআই-এর কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষজ্ঞরা মশার কীটনাশক প্রতিরোধী হয়ে ওঠা এবং কীটনাশকের গুণগত মান, সক্রিয় উপাদান ও প্রয়োগ পদ্ধতির বিজ্ঞানভিত্তিক পরীক্ষা জরুরি বলে মনে করেন।
- ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশনে কীটনাশক সরবরাহে একটি সিন্ডিকেট সক্রিয় থাকার অভিযোগ রয়েছে, যেখানে ওষুধের মূল উপাদান কম ব্যবহার করে মান কমানো হচ্ছে।
জনগণের অভিযোগ ও পরিবেশগত প্রভাব:
নগরবাসী সিটি করপোরেশনের মশা নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপের অভাব এবং নিয়মিত ওষুধ ছিটানো বা লার্ভা ধ্বংসের কার্যক্রমের অনুপস্থিতি নিয়ে অভিযোগ করেছেন। সন্ধ্যা থেকে ভোর পর্যন্ত মশার উপদ্রবে জনজীবন অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে। জলবায়ু পরিবর্তন, তাপমাত্রা বৃদ্ধি, অতিরিক্ত বৃষ্টি এবং অপরিকল্পিত নগরায়ণ ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়াতে সাহায্য করছে।
প্রশাসনের প্রস্তুতি:
ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ডেঙ্গু রোগীর চাপ সামলাতে পৃথক আইসোলেশন ওয়ার্ড চালুর প্রস্তুতি নিচ্ছে। জেলা প্রশাসক সাইফুর রহমান ডেঙ্গু সচেতনতা ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা অভিযান জোরদার করতে ওয়ার্ড পর্যায়ে কমিটি গঠন এবং নিয়মিত ফগিং, লার্ভিসাইড ছিটানো, নালা-নর্দমা পরিষ্কার ও আবর্জনা অপসারণের নির্দেশ দিয়েছেন।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন যে, মার্চ থেকে মে মাসের মধ্যে জোরালো মশা নিধন অভিযান ও জনসচেতনতা বাড়ানো না হলে বর্ষা মৌসুমে ময়মনসিংহে ডেঙ্গুর বড় আকারের সংক্রমণ দেখা দিতে পারে।
#ডেঙ্গু #ময়মনসিংহ #মশা নিয়ন্ত্রণ #জনস্বাস্থ্য #ডেঙ্গু প্রতিরোধ