র্যাবের অভিযানে চট্টগ্রামে প্রায় ৫৭৮ টন সরকারি চাল জব্দ, প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার কদমরসুল এলাকায় সরকারি খাদ্যশস্য আত্মসাৎ এবং অবৈধ মজুদের একটি ভয়াবহ চিত্র র্যাবের অভিযানে উন্মোচিত হয়েছে। একটি গুদাম থেকে প্রায় ৫৭৮ টন সরকারি চাল জব্দের ঘটনায় এখন প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের জড়িত থাকার অভিযোগ সামনে এসেছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য বরাদ্দকৃত চাল দীর্ঘদিন ধরে ভিন্ন মোড়কে বাজারজাত করে কোটি কোটি টাকার বাণিজ্য চলছিল।
বুধবার দুপুরে র্যাব-৭, জেলা প্রশাসন ও খাদ্য অধিদপ্তরের একটি যৌথ দল সীতাকুণ্ডের কদমরসুল এলাকার সালেহ কার্পেট কারখানার গুদামে এই অভিযান পরিচালনা করে। অভিযানে গুদামজুড়ে স্তূপ করে রাখা বিপুল পরিমাণ চাল উদ্ধার করা হয়। কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, উদ্ধারকৃত চালের বিভিন্ন বস্তায় সরকারি খাদ্য কর্মসূচির মনোগ্রাম, খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির চিহ্ন, সরকারি সরবরাহ কোড এবং সরকারি সিল পাওয়া গেছে।
অভিযান শেষে র্যাবের এক কর্মকর্তা গণমাধ্যমকে জানান যে, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে তারা জানতে পারেন সরকারি চাল সংগ্রহ করে ভিন্ন মোড়কে বাজারে বিক্রি করা হচ্ছে। এরপর নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও খাদ্য বিভাগের প্রতিনিধিদের সঙ্গে নিয়ে তারা অভিযান পরিচালনা করেন এবং গুদামে বিপুল পরিমাণ চাল খুঁজে পান। তবে, গুদাম কর্তৃপক্ষ চাল সংরক্ষণ ও বিপণনের জন্য কোনো বৈধ কাগজপত্র বা ফুড গ্রেইন লাইসেন্স দেখাতে ব্যর্থ হয়েছে।
তিনি আরও বলেন যে, এত বিপুল পরিমাণ সরকারি খাদ্যশস্য কোনো একক ব্যক্তির পক্ষে মজুদ করা সম্ভব নয়। এর পেছনে একটি সংঘবদ্ধ ও প্রভাবশালী চক্র কাজ করছে। আমরা পুরো নেটওয়ার্ক শনাক্ত করার জন্য কাজ করছি।
খাদ্য অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, উদ্ধার হওয়া চালের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ সরকারের খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি, কাবিখা, টিআর এবং ভিজিএফ প্রকল্পের বরাদ্দ হতে পারে বলে প্রাথমিক ধারণা করা হচ্ছে। অভিযোগ উঠেছে যে, এই চালগুলো দরিদ্র ও নিম্ন আয়ের মানুষের মধ্যে বিতরণের জন্য নির্ধারিত ছিল, কিন্তু একটি অসাধু চক্র গোপনে তা সংগ্রহ করে বাজারে বিক্রি করার চেষ্টা করছিল।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, চালগুলো কোথা থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে, কোন ডিলার বা গুদাম মালিকদের সঙ্গে এর সংযোগ রয়েছে এবং কীভাবে সরকারি খাদ্যশস্য সরবরাহ শৃঙ্খল থেকে এগুলো বেরিয়ে এসেছে, তা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। ইতোমধ্যে বেশ কয়েকজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে এবং গুদামের নথিপত্র জব্দ করা হয়েছে।
অভিযান সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে যে, খাদ্য অধিদপ্তরের অনুমোদন ছাড়া বিপুল পরিমাণ খাদ্যশস্য মজুদ করা এবং ভিন্ন মোড়কে তা বাজারজাত করা খাদ্য নিয়ন্ত্রণ আইনের অধীনে একটি গুরুতর অপরাধ। এই ঘটনায় বিশেষ ক্ষমতা আইন, খাদ্যশস্য নিয়ন্ত্রণ আইনসহ একাধিক ধারায় মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে গভীর রাতে ট্রাকযোগে চাল আনা-নেওয়া চললেও তা রহস্যজনকভাবে প্রশাসনের নজর এড়িয়ে যাচ্ছিল। এই অভিযানের পর পুরো এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয়দের মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে, দরিদ্র মানুষের জন্য বরাদ্দকৃত সরকারি খাদ্যশস্য কীভাবে একটি বাণিজ্যিক গুদামে পৌঁছালো এবং কারা এর পেছনে মূল ভূমিকা পালন করেছে?
সুশীল সমাজ এবং স্থানীয় সচেতন মহল জানিয়েছে যে, কেবল গুদাম মালিককে গ্রেপ্তার করলেই হবে না; এই চক্রের মূল হোতাদেরও আইনের আওতায় আনতে হবে।
#চট্টগ্রাম #সীতাকুণ্ড #সরকারিচাল #র্যাব #খাদ্যআত্মসাৎ #অবৈধমজুদ