যমুনা সারকারখানা: ঘন ঘন বন্ধ, শত কোটি টাকার ক্ষতি ও সিন্ডিকেটের কারসাজি

জামালপুরের সরিষাবাড়ীতে অবস্থিত দেশের অন্যতম বৃহৎ রাষ্ট্রীয় ইউরিয়া উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান যমুনা সারকারখানা (জেএফএফ) ঘন ঘন বন্ধ থাকছে। কখনো গ্যাসের চাপ কম থাকা, আবার কখনো যান্ত্রিক ত্রুটির অজুহাত দেখিয়ে ওভারহোলিংয়ের নামে বছরের সিংহভাগ সময়ই এর উৎপাদন বন্ধ রাখা হচ্ছে। এর ফলে সরকার শত শত কোটি টাকা লোকসান গুনছে এবং কৃষিখাতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
কারখানাটির দৈনিক ১৭০০ টন ইউরিয়া উৎপাদন ক্ষমতা থাকলেও, গ্যাসের চাপ কম থাকায় উৎপাদন হচ্ছে মাত্র ১২০০ টন। স্বাভাবিক উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় বছরে ৪৩২ হাজার মেট্রিক টন সারের পরিবর্তে ৫ লাখ ৬১ হাজার মেট্রিক টন উৎপাদন সম্ভব হচ্ছে না। এক মাস কারখানা বন্ধ থাকলে সরকারকে সার আমদানিতে অতিরিক্ত ২৩৭ কোটি ৬০ লাখ টাকা ব্যয় করতে হয়। এই অতিরিক্ত ব্যয় দেশের বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে, বিশেষ করে কৃষির ভরা মৌসুমে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, তিতাস গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের সাথে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহের চুক্তি থাকলেও, বর্তমানে তিতাস চুক্তি মোতাবেক গ্যাস সরবরাহ করছে না। এর পেছনে সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেটের কারসাজি রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এই সিন্ডিকেট, যার সাথে কারখানার অসাধু কর্মকর্তা এবং রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তিরা জড়িত, যান্ত্রিক ত্রুটির অজুহাতে কারখানার যন্ত্রাংশ স্ক্র্যাপ হিসেবে পাচার করে বিপুল অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে। এমনকি, ইঁদুরের কামড়ে বৈদ্যুতিক তার কেটে গিয়ে পুরো কারখানা অচল হওয়ার মতো অদ্ভুত ঘটনাও ঘটেছে, যা শিল্প নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
কারখানা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, গত বছরের ২৩ ডিসেম্বর উৎপাদন শুরু হলেও, চলতি বছরের ২২ জানুয়ারি গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় এবং ৫ ফেব্রুয়ারি ইঁদুরের কারণে শর্টসার্কিটে উৎপাদন বন্ধ হয়। ১৫ ফেব্রুয়ারি গ্যাসের চাপ ৫.২ কেজিতে নেমে আসায় আবারও উৎপাদন বন্ধ করতে বাধ্য হয় কর্তৃপক্ষ। ১৭ ফেব্রুয়ারি তিতাস কর্তৃপক্ষ রমজান মাসে গ্যাস সরবরাহ সম্ভব নয় বলে জানায়।
যমুনা সারকারখানা কর্তৃপক্ষ, সার সরবরাহকারী ডিলার এবং কৃষকরা অন্যান্য শিল্পের চেয়ে দ্বিগুণ দামে গ্যাস কিনেও নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ না পাওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। বাংলাদেশ ফার্টিলাইজার অ্যাসোসিয়েশন (বিএফএ)-এর নেতারা বলছেন, যমুনার সারের গুণগত মান ভালো হওয়ায় কৃষকদের চাহিদা বেশি। উৎপাদন বন্ধ থাকলে আমদানির ওপর নির্ভরতা বাড়ে, যা অতীতে মান ও দাম নিয়ে অভিযোগ সৃষ্টি করেছে।
শিল্প বিশ্লেষকরা মনে করেন, জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় সঠিক সমন্বয় ও নীতিমালার অভাবে রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো বারবার সমস্যার মুখে পড়ছে। দ্রুত কার্যকর সমাধান না হলে এর প্রভাব কৃষি খাত ও বৈদেশিক মুদ্রার ওপর মারাত্মকভাবে পড়বে।