যুক্তরাষ্ট্র-চীন বৈশ্বিক নেতৃত্বের প্রতিযোগিতা: বাণিজ্য, অর্থনীতি ও সামরিক শক্তির তুলনামূলক চিত্র

বিশ্বের দুটি প্রধান পরাশক্তি, যুক্তরাষ্ট্র এবং চীন, বর্তমানে বৈশ্বিক নেতৃত্বের আসনে অধিষ্ঠিত হওয়ার জন্য তীব্র প্রতিযোগিতায় লিপ্ত। ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধের কারণে পূর্বনির্ধারিত কিছু বৈঠক স্থগিত হওয়ার পর, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আগামী ১৪ ও ১৫ মে বেইজিংয়ে চীনা প্রেসিডেন্ট শি চিন পিংয়ের সঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে মিলিত হতে যাচ্ছেন। প্রায় এক দশক পর কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্টের চীন সফরকে কেন্দ্র করে বিশ্বজুড়ে ব্যাপক আগ্রহ এবং কৌতূহল সৃষ্টি হয়েছে।
অতীতে বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন সূচকে যুক্তরাষ্ট্রের যে একচ্ছত্র আধিপত্য ছিল, তা বর্তমানে চীন অনেকাংশে কমিয়ে এনেছে এবং নিজেদেরকে বিশ্বের ‘কারখানা’ হিসেবে সুপ্রতিষ্ঠিত করেছে। নিচে বিভিন্ন সূচকের নিরিখে দুই দেশের শক্তির একটি তুলনামূলক চিত্র উপস্থাপন করা হলো:
বাণিজ্য: ২৫ বছর আগে যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের শীর্ষ রপ্তানিকারক দেশ হিসেবে পরিচিত ছিল। কিন্তু বর্তমানে সেই স্থানটি চীনের দখলে। বর্তমানে চীন বার্ষিক প্রায় ৩.৫৯ ট্রিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি করে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের রপ্তানির পরিমাণ ১.৯ ট্রিলিয়ন ডলার। বর্তমানে ১৪৫টি দেশের প্রধান বাণিজ্যিক অংশীদার হিসেবে চীন নিজেদের অবস্থান তৈরি করেছে। তবে, যুক্তরাষ্ট্র এখনো চীনের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদার হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
ঋণ: যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় ঋণের পরিমাণ ৩৯ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেছে, যা দেশটির জিডিপির ১১৫ শতাংশের সমতুল্য। অন্যদিকে, চীনের সরকারি তথ্য অনুযায়ী তাদের ঋণের পরিমাণ জিডিপির ৯৪ শতাংশ। তবে, অনেক বিশ্লেষকের মতে, চীনের প্রকৃত ঋণের পরিমাণ এই দাবিকৃত পরিমাণের চেয়ে বেশি হতে পারে।
সামরিক শক্তি: সামরিক খাতে ব্যয়ের দিক থেকে যুক্তরাষ্ট্র এখনো অন্য কোনো দেশের তুলনায় এগিয়ে রয়েছে। ২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্র তার জিডিপির ৩.১ শতাংশ, যা প্রায় ৯৫৪ বিলিয়ন ডলার, সামরিক খাতে ব্যয়ের পরিকল্পনা করেছে। একই সময়ে, চীন এই খাতে প্রায় ৩৩৬ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করেছে। আকাশপথে যুক্তরাষ্ট্রের সক্ষমতা অনেক বেশি হলেও, সমুদ্রে রণতরীর সংখ্যার দিক থেকে চীন বর্তমানে এগিয়ে আছে।
প্রযুক্তি ও জ্বালানি: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) খাতে ১০০ বিলিয়ন ডলারের বেশি বিনিয়োগ করে যুক্তরাষ্ট্র এই ক্ষেত্রে নেতৃত্ব দিলেও, ইলেকট্রিক গাড়ির বাজারে বর্তমানে চীন বিশ্বনেতা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। এছাড়াও, বিরল খনিজ সম্পদের বৈশ্বিক মজুত এবং সেগুলোর প্রক্রিয়াকরণের ক্ষেত্রে চীন একচেটিয়া আধিপত্য বজায় রেখেছে। অন্যদিকে, জ্বালানি ব্যবহারের দিক থেকে চীন শীর্ষে থাকলেও, পরিবেশবান্ধব জ্বালানি বা গ্রিন এনার্জিতে চীনের বিনিয়োগ যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় প্রায় তিন গুণ বেশি।
ভবিষ্যৎ গতিপথ: চীনের অর্থনৈতিক মডেল মূলত রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত এবং দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার ওপর নির্ভরশীল। এর বিপরীতে, ট্রাম্প প্রশাসনের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতি প্রধানত শুল্ক আরোপ, কর ছাড় এবং অভ্যন্তরীণ শিল্পায়নের ওপর কেন্দ্রীভূত।
বিশ্লেষকদের মতে, প্রযুক্তি এবং বাণিজ্যের ক্ষেত্রে এই দুই পরাশক্তির মধ্যে চলমান প্রতিযোগিতা আগামী দিনে বৈশ্বিক ব্যবস্থায় এক নতুন রূপরেখা তৈরি করবে।
সূত্র: আল-জাজিরা #যুক্তরাষ্ট্র #চীন #বৈশ্বিকপ্রতিযোগিতা #অর্থনীতি #সামরিকশক্তি