কমিউনিটি
১৭ মার্চ, ২০২৬

বিশ্ব সংকট, মিডিয়ার নৈতিক স্খলন ও সার্বভৌমত্বের বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিরক্ষা

বিশ্ব সংকট, মিডিয়ার নৈতিক স্খলন ও সার্বভৌমত্বের বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিরক্ষা

বর্তমান বিশ্ব জায়নবাদী সাম্রাজ্যবাদ, আঞ্চলিক আধিপত্যবাদ এবং পরিকল্পিত ইসলামোফোবিয়ার এক জটিল সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। এই দ্বিমুখী সংকটের মধ্যে একশ্রেণির করপোরেট ও মেরুদণ্ডহীন মিডিয়া ক্ষমতার দালালি এবং তৈলমর্দনকে সাংবাদিকতার মূলমন্ত্র হিসেবে গ্রহণ করে সবচেয়ে শোচনীয় ভূমিকা পালন করছে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই চিত্র আরও ভয়াবহ, যেখানে গণমাধ্যমের একটি বড় অংশ নিজেদের মান-মর্যাদা বিকিয়ে দিয়ে ক্ষমতাসীনদের পদলেহন ও ইসলামবিদ্বেষী বয়ান তৈরিতে ব্যস্ত।

 

জায়নবাদী সাম্রাজ্যবাদ ও বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট: জায়নবাদ আধুনিক বিশ্বের সবচেয়ে নৃশংস ও প্রভাবশালী মতাদর্শ। ফিলিস্তিনে অবৈধ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যে যে অশান্তির বীজ বপন করা হয়েছিল, তা আজ বিশ্ব অশান্তির মহিরুহে পরিণত হয়েছে। পশ্চিমা শক্তিগুলোর, বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অন্ধ সমর্থনে জায়নবাদীরা শুধু ভূখণ্ড দখলই করছে না, বরং বৈশ্বিক অর্থনীতি, রাজনীতি ও তথ্যপ্রবাহকে সুকৌশলে নিয়ন্ত্রণ করছে। তারা বুদ্ধিবৃত্তিক যুদ্ধের মাধ্যমে মুসলিম উম্মাহর মেরুদণ্ড ভেঙে দিতে চায়, যেখানে বিশ্ব মিডিয়া তাদের অমানবিকতাকে ‘আত্মরক্ষা’ হিসেবে চালিয়ে দেওয়ার নির্লজ্জ চেষ্টা করে।

 

আঞ্চলিক আধিপত্যবাদ ও বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব: বাংলাদেশের ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ভারতীয় আধিপত্যবাদ এক অস্তিত্ব রক্ষার চ্যালেঞ্জ। নদ-নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা থেকে বঞ্চিত করা, সীমান্তে নিরীহ বাংলাদেশি হত্যা এবং বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে দিল্লির নির্লজ্জ হস্তক্ষেপ—এসবই আধিপত্যবাদের নগ্ন বহিঃপ্রকাশ। সাংস্কৃতিক সাম্রাজ্যবাদের মাধ্যমে বাংলাদেশের নিজস্ব ঐতিহ্য ও ধর্মীয় মূল্যবোধকে আঘাত করা হচ্ছে, যা এ দেশের সার্বভৌমত্বকে বারবার হুমকির মুখে ফেলছে।

 

বৈশ্বিক ও স্থানীয় ইসলামোফোবিয়া: নাইন-ইলেভেনের পর থেকে বিশ্বজুড়ে ‘ইসলামোফোবিয়া’কে একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। ইসলামকে সন্ত্রাসের সমার্থক হিসেবে দাঁড় করানোর এক নোংরা খেলা চলছে। বাংলাদেশে এই ইসলামোফোবিয়া আরও সূক্ষ্ম ও বিষাক্ত, যেখানে তথাকথিত ‘প্রগতিশীলতা’র মোড়কে ইসলামের মৌলিক বিশ্বাসের ওপর আঘাত হানা হয়। দাড়ি, টুপি বা পর্দার মতো ধর্মীয় নিদর্শনগুলো উপহাস করা এবং মাদরাসাশিক্ষাকে ‘জঙ্গিবাদের সূতিকাগার’ হিসেবে প্রমাণের নিরন্তর চেষ্টা করা এ দেশের একশ্রেণির মিডিয়ার নিত্যনৈমিত্তিক কাজ।

 

বাংলাদেশি মিডিয়ার নৈতিক স্খলন: বাংলাদেশের গণমাধ্যমের ইতিহাসে সাম্প্রতিক বছরগুলো এক কলঙ্কিত অধ্যায়। অধিকাংশ পত্রিকা ও টেলিভিশন চ্যানেল এখন ক্ষমতাসীনদের ‘জনসংযোগ বিভাগ’ হিসেবে কাজ করছে। তৈলমর্দনের সংস্কৃতি এমন একপর্যায়ে পৌঁছেছে যে, সাংবাদিকতার ন্যূনতম মানদণ্ডও আজ বিলুপ্তপ্রায়। জনদুর্ভোগ, দুর্নীতি ও ভোটাধিকার হরণের খবরগুলো চেপে গিয়ে তারা ক্ষমতার স্তুতি গাইতে ব্যস্ত। এই মেরুদণ্ডহীন ও পদলেহী সাংবাদিকতা জাতিকে এক ভয়াবহ অন্ধত্বের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

 

স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিরক্ষা: একটি দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় শক্তিশালী বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিরক্ষাব্যবস্থা প্রয়োজন। যখন একটি দেশের মিডিয়া সাম্রাজ্যবাদ ও আধিপত্যবাদের কাছে নতজানু হয়, তখন সেই দেশের স্বাধীনতা বিপন্ন হয়ে পড়ে। ইসলামোফোবিয়া ছড়িয়ে দিয়ে দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ঐক্য নষ্ট করার চেষ্টা করা হচ্ছে, যাতে জাতিকে সহজেই বিভাজিত ও শাসন করা যায়। আঞ্চলিক আধিপত্যবাদী শক্তি চায় বাংলাদেশ যেন তাদের একটি ‘ক্লায়েন্ট স্টেট’ হয়ে থাকে, আর এ কাজে সবচেয়ে বড় বাধা হলো এ দেশের মানুষের ইসলামি মূল্যবোধ এবং দেশপ্রেম।

 

করণীয় ও উত্তরণের পথ: এই জটিল সংকট থেকে উত্তরণের জন্য একটি সামগ্রিক গণজাগরণ প্রয়োজন।

  • বিকল্প ও দেশপ্রেমিক মিডিয়াকে শক্তিশালী করা।
  • আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে তরুণ প্রজন্মকে সচেতন করা।
  • ইসলামি মূল্যবোধের সুরক্ষা এবং বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে ইসলামের সঠিক রূপ তুলে ধরা।
  • ক্ষমতার দালালি করা মিডিয়া হাউসগুলোকে সামাজিকভাবে বয়কট করা।

সাম্রাজ্যবাদ, আধিপত্যবাদ এবং ইসলামোফোবিয়া—এই তিন দানব আজ হাত মিলিয়ে মানবতার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছে, আর এর সহায়ক শক্তি হিসেবে কাজ করছে একশ্রেণির পদলেহী দালাল মিডিয়া। স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার এই লড়াইয়ে কলমই হোক আমাদের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার। সত্যের বিজয় অবশ্যম্ভাবী; চাটুকারিতা, তৈলমর্দন ও আধিপত্যবাদ শেষ পর্যন্ত ইতিহাসের আস্তাকুঁড়েই নিক্ষিপ্ত হবে।

#জায়নবাদ #ইসলামোফোবিয়া #ভারতীয়আধিপত্যবাদ #বাংলাদেশেরগণমাধ্যম #সার্বভৌমত্ব